২২ জুন ২০২৬

দৈনন্দিন / মৃত‍্যু

এক দুর্ঘটনায় ভেঙে গেল পাঁচ পরিবারের স্বপ্ন, শোকে স্তব্ধ কানাইঘাট

সুজন চন্দ অনুপ

প্রকাশঃ ২১ জুন, ২০২৬ ৮:৫৫ অপরাহ্ন


আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ পরই দেশে ফেরার কথা ছিল কাদির আহমদের। চার বছর ধরে কাতারে কঠোর পরিশ্রম করে কিছু টাকা জমিয়েছিলেন। পরিবারের জন্য নতুন ঘর তুলবেন, ছোট ভাইয়ের পড়াশোনার খরচ দেবেন—এমন নানা স্বপ্ন নিয়ে দিন গুনছিলেন তিনি। কিন্তু সেই ফেরা আর হলো না। কাতারের এক সড়কে ভয়াবহ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন তিনি।


কাদির একা নন। একই দুর্ঘটনায় সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার আরও চার প্রবাসীর জীবন থেমে গেছে। জীবিকার সন্ধানে হাজার মাইল দূরে পাড়ি দেওয়া পাঁচ তরুণের মৃত্যুতে এখন শোকের জনপদে পরিণত হয়েছে কানাইঘাটের কয়েকটি গ্রাম।


রোববার বাংলাদেশ সময় সকাল ১০টার দিকে কাতারের রাজধানী দোহা থেকে আল-শাহানিয়া শহরে কর্মস্থলে যাওয়ার পথে একটি প্রাইভেট ট্যাক্সি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। স্থানীয় সূত্র ও নিহতদের স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, আল-শাহানিয়ার সামাল এলাকায় পৌঁছানোর পর গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়ক থেকে ছিটকে পড়ে দুমড়েমুচড়ে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই গাড়ির ভারতীয় চালকসহ ছয়জনের মৃত্যু হয়। নিহত পাঁচ বাংলাদেশিই কানাইঘাট উপজেলার বাসিন্দা।


নিহতরা হলেন ঝিঙ্গাবাড়ী ইউনিয়নের আমরপুর গ্রামের জিবাল আহমদ (৩৫), মাঝতালুক গ্রামের জসিম উদ্দিন (৩৮), আগতালুক গ্রামের মস্তাক আহমদ (২৭) ও জুবের আহমদ (২৮), এবং দক্ষিণ বাণীগ্রাম ইউনিয়নের নিজ গাছবাড়ি গ্রামের কাদির আহমদ (৩৩)।


দুর্ঘটনার খবর গ্রামে পৌঁছানোর পর থেকেই স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে চারপাশ। কানাইঘাটের বিভিন্ন গ্রামে দেখা গেছে, নিহতদের বাড়িতে ভিড় করছেন আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। কেউ সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা খুঁজে পাচ্ছেন না।


‘আগামী মাসে বাড়ি আসার কথা ছিল’
নিজ গাছবাড়ি গ্রামের কাদির আহমদের বাবা বাহার উদ্দিন ছেলের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন।


 তিনি বলেন, “চার বছর আগে সংসারের অভাব দূর করতে কাতারে গিয়েছিল। কয়েক দিন আগেও ফোনে বলেছিল, আগামী মাসে দেশে আসবে। এখন সে আর ফিরবে না, ফিরবে শুধু তার লাশ।”


পরিবারের সদস্যরা জানান, কাদিরের উপার্জনের ওপরই অনেকটা নির্ভরশীল ছিল পরিবার। তার মৃত্যুতে পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।


দুই শিশুকে নিয়ে অনিশ্চয়তায় জসিমের স্ত্রী
নিহত জসিম উদ্দিনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, স্বজনদের কান্নায় পরিবেশ ভারী হয়ে আছে। ঘরের এক কোণে বসে থাকা স্ত্রী শাহিনা বেগম বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন।


তিনি বলেন, “তিন বছর আগে সংসারের জন্য বিদেশে গিয়েছিল। দুই সন্তানকে মানুষ করার স্বপ্ন ছিল। এখন আমি দুই সন্তান নিয়ে কোথায় যাব, কীভাবে চলব?”


প্রতিবেশীরা জানান, জসিমের উপার্জনই ছিল পরিবারের প্রধান অবলম্বন।


বাবার মতো ছেলেরও মৃত্যু প্রবাসে
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখা গেছে জুবের আহমদের বাড়িতে। তার মা জাহানারা বেগম বারবার বলছিলেন, “আমার কপালই খারাপ।”


স্বজনেরা জানান, প্রায় ১৪ বছর আগে জুবেরের বাবা প্রবাসে এক দুর্ঘটনায় মারা যান। সেই সময় ছোট্ট জুবেরকে বুকে আগলে রেখে জীবনযুদ্ধ শুরু করেছিলেন তার মা। পরে জুবের বড় হয়ে সংসারের হাল ধরতে কাতারে যান। কিন্তু বাবার মতো তিনিও দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন।


চার বছরের একটি সন্তান রেখে গেছেন জুবের। এখন সেই শিশুটিও বাবাহীন হয়ে পড়ল।


এদিকে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিহত পাঁচজনের বেশির ভাগই নিম্নআয়ের পরিবারের সন্তান। পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি ঘটাতে তারা কাতারে পাড়ি জমিয়েছিলেন। কেউ কয়েক বছর ধরে, কেউবা আরও আগে থেকে সেখানে কাজ করছিলেন।


স্থানীয় ঝিঙ্গাবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু বক্কর বলেন, “নিহত পাঁচজনের মধ্যে চারজন আমার ইউনিয়নের বাসিন্দা। তাদের অধিকাংশ পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। এই মৃত্যু শুধু পাঁচটি প্রাণের ক্ষতি নয়, পাঁচটি পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার ঘটনা।”


এদিকে কানাইঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেদী হাসান শাকিল বলেন, দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের নিহতদের পরিবারের খোঁজখবর নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।


তিনি বলেন, “উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে। পাশাপাশি মরদেহ দেশে আনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।”


দক্ষিণ বাণীগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান লোকমান আহমদ বলেন, নিহত কাদির আহমদের পরিবারের সঙ্গে তিনি কথা বলেছেন। তাদের পাশে থাকার চেষ্টা করছেন।


শেয়ার করুনঃ

দৈনন্দিন থেকে আরো পড়ুন

কাতার দুর্ঘটনা, কানাইঘাট প্রবাসী মৃত্যু, কাতারে বাংলাদেশি নিহত, কাদির আহমদ, জুবের আহমদ, জসিম উদ্দিন, সিলেট সংবাদ, প্রবাসী শ্রমিক, সড়ক দুর্ঘটনা কাতার, কানাইঘাট

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ