১৭ জুন ২০২৬

যাপিতজীবন / ভ্রমণ

নদী-পাহাড়-চা বাগানের মায়াজালে ‘লোভাছড়া’, পর্যটনের অপার সম্ভাবনা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশঃ ১৬ জুন, ২০২৬ ১২:১৬ অপরাহ্ন


সিলেটের কানাইঘাটের সীমান্তবর্তী জনপদ লোভাছড়া। ভারতের মেঘালায় রাজ্য ঘেষা নির্জন প্রকৃতির অনন্য স্থান ‘লোভাছড়া’। সিলেটের জাফলং, সাদাপাথর, বিছনাকান্দি কিংবা রাতারগুলের মতো ‘লোভাছড়া’ সৌন্দর্য কোনো কিছুতেই কমতি নেই।  

বর্ষায় নৌকা আর শুষ্ক মৌসুমে হাঁটা কিংবা মোটরসাইকেলই ভরসা। লোভা নদী পেরিয়ে, আঁকাবাঁকা মাটির পথ ধরে, ছোট-বড় টিলা অতিক্রম করে এগোতে হয় লোভাছড়ার জিরো পয়েন্টের দিকে। দীর্ঘ এই পথচলাই পর্যটকদের কাছে হয়ে ওঠে রোমাঞ্চকর ভ্রমণ। 

লোভাছড়ার সৌন্দর্য শুধু তার প্রকৃতিতে নয়, যাত্রাপথেও। পথের প্রতিটি বাঁক, নদী পারাপারের প্রতিটি মুহূর্ত এবং টিলার চূড়ায় দাঁড়িয়ে দেখা প্রতিটি দৃশ্য ভ্রমণপিপাসুদের জন্য হয়ে ওঠে একেকটি স্মৃতি। তাই অনেকের কাছে লোভাছড়া ভ্রমণ মানে শুধু দর্শন নয়, বরং প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যাওয়ার এক অনন্য অভিজ্ঞতা।

লোভাছড়াকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত করতে প্রশাসনের কোনো উদ্যোগ নেই। অবশ্য স্থানীয় সরকার বিভাগ ওই এলাকায় একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে বলে জানিয়েছেন কানাইঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মেহেদী হাসান শাকিল। 

তিনি বলেন, সম্ভবত এলজিইডি একটি সেতু করার জন্য উচ্চ পর্যায়ে চেষ্টা করছে। যদি সেতু হয় তবে লোভাছড়া একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হবে।

কানাইঘাট উপজেলার ১নং লক্ষ্মীপ্রসাদ ইউনিয়নের মূলাগুল এলাকায় অবস্থিত লোভাছড়া প্রকৃতির এক অনন্য উপহার। উত্তর-পশ্চিমে বয়ে চলা লোভা নদী এবং দক্ষিণ-পূর্বে প্রবাহিত সুরমা নদী অঞ্চলটিকে যেন প্রাকৃতিকভাবে ঘিরে রেখেছে। এর সঙ্গে দেছই, কালিজুড়ি ও নুন নদীসহ অসংখ্য ছোট-বড় খাল ও নদী মিলে পুরো এলাকাকে অনেকটা দ্বীপসদৃশ রূপ দিয়েছে।

পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ ব্রিটিশ আমলে নির্মিত ঝুলন্ত সেতু, ঐতিহ্যবাহী লোভাছড়া চা-বাগান, ভারত থেকে নেমে আসা স্বচ্ছ পানির লোভা নদী। 

লোভাছড়ার উপর ব্রিটিশ আমলের ঝুলন্ত সেতু।

প্রাকৃতিক সম্পদেও সমৃদ্ধ লোভাছড়া। এখানে রয়েছে পাথর কোয়ারি, বালুমহাল, জলমহাল এবং প্রায় তিন শতাব্দী পুরোনো জনবসতির ইতিহাস। ছোট-বড় পাহাড়, উঁচু-নিচু টিলা ও পাহাড়ি নদীগুলো পর্যটন শিল্প বিকাশের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। স্থানীয়দের মতে, এসব বৈচিত্র্যের কারণেই লোভাছড়া এখন অনেকের কাছে ‘প্রকৃতির রূপকন্যা’ হিসেবে পরিচিত।

তবে অপার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও যোগাযোগ অবকাঠামোর দুর্বলতা এই অঞ্চলের সবেচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। লোভা নদীর ওপর কোনো সেতু না থাকায় উপজেলা সদরের সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। বর্ষাকালে নৌকাই ভরসা, আর শুকনো মৌসুমে দীর্ঘ পথ হেঁটে কিংবা মোটরসাইকেলে যেতে হয়। কানাইঘাট উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরের মূল পর্যটন এলাকায় পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় দুই ঘণ্টা। 

সাইফুল ইসলাম নামে এক পর্যটক বলেন, সিলেটের অনেক পর্যটনকেন্দ্রে ঘুরেছি। কিন্তু লোভাছড়ার যাত্রাপথই আলাদা অভিজ্ঞতা দিয়েছে। নদী, টিলা আর চা-বাগান মিলিয়ে পুরো পথটাই যেন প্রকৃতির এক জীবন্ত ক্যানভাস। যোগাযোগব্যবস্থা ভালো হলে এখানে পর্যটকের সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে যাবে।

মুলাগুল এলাকার বাসিন্দা আব্দুল কাদির বলেন, এখানে প্রকৃতির রূপে কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু নদীর ওপর একটি সেতু না থাকায় মানুষ সহজে আসতে পারে না। পর্যটক বাড়লে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান হবে, ব্যবসা-বাণিজ্যও সম্প্রসারিত হবে। তাই দ্রুত সেতু নির্মাণ জরুরি।

কানাইঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মেহেদী হাসান শাকিল সিলেট ভয়েসকে বলেন, যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে লোভাছড়াকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত করতে এমন কোনো নির্দেশনা এখন পর্যন্ত আসেনি। তবে সম্ভবত স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) লোভা নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণের জন্য উচ্চপর্যায়ে চেষ্টা করছে। সেতু নির্মিত হলে লোভাছড়া গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হবে। সরকার উদ্যোগ নিলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হবে।


শেয়ার করুনঃ

যাপিতজীবন থেকে আরো পড়ুন

সিলেট, লোভাছড়া, কানাইঘাট, পর্যটন, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ