১২ জুন ২০২৬

খেলাধুলা-বিনোদন / বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬

বাঁশির অপেক্ষা, শুরু হতে যাচ্ছে বিশ্বকাপ

সিলেটে উৎসবের আমেজ, শেষ সময়ে জমে উঠেছে জার্সির বাজার

দেবকল্যাণ ধর বাপন

প্রকাশঃ ১১ জুন, ২০২৬ ১০:২৫ অপরাহ্ন


আর মাত্র ঘণ্টা কয়েকের অপেক্ষা। এরপরই বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে বাজবে উদ্বোধনী বাঁশি। চার বছর পর পর আসা এই মহাযজ্ঞকে ঘিরে সিলেটে এখন উৎসবের আবহ। খেলা শুরুর আগেই নগরের বিপণিবিতান, ক্রীড়া সামগ্রীর দোকান ও ফুটপাতজুড়ে দেখা যাচ্ছে ফুটবলপ্রেমীদের ভিড়। কেউ কিনছেন প্রিয় দলের জার্সি, কেউ সংগ্রহ করছেন পতাকা, স্কার্ফ কিংবা হেডব্যান্ড। বিশ্বকাপের উত্তাপ যেন মাঠে গড়ানোর আগেই ছড়িয়ে পড়েছে নগরজুড়ে।

বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বিকেল, বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত নগরের বন্দরবাজার, জিন্দাবাজার, আম্বরখানা, কুমারপাড়া ও নয়াসড়ক এলাকা ঘুরে দেখা যায়, জার্সির দোকানগুলোতে ক্রেতাদের চোখে পড়ার মতো ভিড়। সবচেয়ে বেশি চাহিদা আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের জার্সির। তবে ফ্রান্স, পর্তুগাল, স্পেন ও জার্মানির জার্সিও বিক্রি হচ্ছে ভালো।

বন্দরবাজারের একটি ক্রীড়া সামগ্রীর দোকানে আর্জেন্টিনার জার্সি বেছে নিচ্ছিলেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মাহিন আহমদ। তিনি বলেন, বিশ্বকাপ এলে আমরা বন্ধুদের সঙ্গে আলাদা পরিকল্পনা করি। খেলা দেখার জন্য একসঙ্গে জড়ো হই। জার্সি পরে খেলা দেখার মধ্যে অন্য রকম আনন্দ আছে। তাই শেষ মুহূর্তে এসে জার্সি কিনে নিচ্ছি।

একই দোকানে ব্রাজিলের জার্সি কিনছিলেন ব্যবসায়ী তানভীর হোসেন। তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকে ব্রাজিল সমর্থন করি। বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগে নতুন জার্সি না কিনলে উৎসবটাই যেন অসম্পূর্ণ লাগে। এবার পরিবারের সদস্যদের জন্যও জার্সি কিনেছি।

জিন্দাবাজারে বন্ধুদের সঙ্গে জার্সি কিনতে এসেছিলেন কলেজছাত্রী সাদিয়া ইসলাম। তিনি বলেন, আমাদের বন্ধুদের মধ্যে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল সমর্থকদের আলাদা গ্রুপ আছে। বিশ্বকাপ চলাকালে সবাই মিলে খেলা দেখি। তাই আগে থেকেই জার্সি কিনে রাখছি।

নয়াসড়কে পর্তুগালের জার্সি হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন ব্যাংক কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল মামুন। তার ভাষ্য, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর খেলা দেখেই ফুটবলকে ভালোবাসতে শিখেছি। বিশ্বকাপ মানেই আবেগের জায়গা। তাই প্রিয় দলের জার্সি সংগ্রহ করতে এসেছি।

শুধু তরুণ নয়, শিশু-কিশোরদের মধ্যেও বিশ্বকাপের উন্মাদনা দেখা যাচ্ছে। বন্দরবাজারে বাবার সঙ্গে জার্সি কিনতে আসা স্কুলশিক্ষার্থী আদনান রহমান বলে, “আমি মেসির ভক্ত। তাই আর্জেন্টিনার জার্সিই কিনেছি। খেলা শুরু হওয়ার জন্য আর অপেক্ষা করতে পারছি না।

বিক্রেতারা বলছেন, বিশ্বকাপ যত কাছে আসছে, ততই বেড়েছে বিক্রি। গত এক সপ্তাহে অনেক দোকানের বিক্রি কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

জিন্দাবাজারের ক্রীড়া সামগ্রী বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান প্লেয়ারস জোনের স্বত্বাধিকীকারি রিপন বৈশ্য বলেন, সাধারণ সময়ে দিনে ২০-৩০টি জার্সি বিক্রি হয়। এখন প্রতিদিন ১৫০টিরও বেশি বিক্রি হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের জার্সি। অনেক সময় দোকানে আনার পরদিনই পুরো চালান শেষ হয়ে যাচ্ছে।

তিনি জানান, কাপড়ের মান ও ডিজাইনের ওপর ভিত্তি করে জার্সির দাম ৩০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে।

বন্দরবাজারের ব্যবসায়ী সুমন দাস বলেন, বিশ্বকাপকে সামনে রেখে ৫ দফায় জার্সি এনেছি। কিন্তু চাহিদা এত বেশি যে বারবার নতুন পণ্য আনতে হচ্ছে। বিশেষ করে শিশুদের জার্সির চাহিদা এবার বেশি।

বন্দরবাজার এলাকায় অস্থায়ী স্টলে জার্সি বিক্রি করছেন শাহিন মিয়া। তিনি বলেন, বিশ্বকাপের সময়টাই আমাদের সবচেয়ে ভালো ব্যবসার মৌসুম। সন্ধ্যার পর ক্রেতাদের সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। খেলা শুরু হলে বিক্রি আরও বাড়বে বলে আশা করছি।

জার্সির পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের পতাকা, স্কার্ফ, ক্যাপ, হুইসেল ও স্টিকারের বিক্রিও বেড়েছে। অনেকেই পাড়া-মহল্লা কিংবা বাসার ছাদে টাঙানোর জন্য বড় আকারের পতাকা কিনছেন।

বন্দরবাজারের আরেক দোকানি রুবেল আহমদ বলেন, জার্সির পাশাপাশি পতাকার চাহিদাও অনেক। বিশেষ করে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের বড় পতাকা বেশি বিক্রি হচ্ছে। অনেক সমর্থক দলবেঁধে এসে কিনছেন।

বিশ্বকাপকে ঘিরে সিলেটে যে উন্মাদনা তৈরি হয়েছে, সেটিকে শুধু খেলার প্রতি ভালোবাসা বললে কম বলা হবে। এটি যেন সামাজিক এক উৎসবে পরিণত হয়েছে। চায়ের দোকান, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস, অফিসের আড্ডা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সবখানেই এখন বিশ্বকাপের আলোচনা।

ফুটবলপ্রেমী রাশেদুল করিম বলেন, বাংলাদেশ বিশ্বকাপে খেলে না, কিন্তু বিশ্বকাপ এলে আমরা নিজেদেরই অংশ মনে করি। প্রিয় দলকে ঘিরে তর্ক, আড্ডা, জার্সি পরা, পতাকা টানানো সব মিলিয়ে এটা আমাদের জন্য উৎসব।

নগরের আরেক সমর্থক নাদিরা নিশাত বলেন, আমাদের বাসায় সবাই ভিন্ন ভিন্ন দলের সমর্থক। বিশ্বকাপ শুরু হলে খেলা দেখা নিয়ে আলাদা আনন্দ তৈরি হয়। এবার পরিবারের সবাই নতুন জার্সি কিনেছি।

বিশ্বকাপের উদ্বোধনী বাঁশি এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। তবে সিলেটে উৎসবের বাঁশি বেজে গেছে আগেই। জার্সির বাজারে ভিড়, পতাকার রঙ আর সমর্থকদের উচ্ছ্বাস বলে দিচ্ছে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরকে বরণ করে নিতে প্রস্তুত সিলেট।

এদিকে, বিশ্বকাপ ফুটবল আসলেই বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মাঝে সব সময়ই অন্যরকম একটা আবেগ ও উদ্দীপনা কাজ করে। যার জন্য বিশ্বকাপ ঘিরে শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. খায়রুল ইসলাম বলেন, এবার শিক্ষার্থীরা যেন নিরাপদ ও উৎসবমুখর পরিবেশে খেলা উপভোগ করতে পারে, সে জন্য ছয়টি আবাসিক হলে বড় পর্দায় ম্যাচ দেখানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

এদিকে সিলেট সিটি করপোরেশনও নগরজুড়ে বিশ্বকাপ উপভোগের ব্যবস্থা নিয়েছে। নগরবাসী যেনো একসঙ্গে খেলা উপভোগ করতে পারে সেজন্য প্রশাসকের উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি স্থানে এলইডি স্ক্রিনে খেলা দেখানোর পরিকল্পনাও হাতে নিয়েছে সিটি প্রশাসন।

সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, ফুটবল বিশ্বকাপকে ঘিরে সিলেট নগরবাসীর জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ড থেকে সিলেট সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে এলইডি মনিটরের ব্যবস্থা করা হবে। এর মাধ্যমে ফুটবলপ্রেমীরা সারা রাত খেলা উপভোগ করতে পারবেন।


শেয়ার করুনঃ

খেলাধুলা-বিনোদন থেকে আরো পড়ুন

সিলেট, বিশ্বকাপ ফুটবল, ফুটবল, জার্সি, পতাকা

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ