০৬ জুন ২০২৬

খেলাধুলা-বিনোদন / খেলাধুলা

উইমেন’স সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ

মুকুট ফিরে পেতে উন্মুখ ভারত, বাংলাদেশের লক্ষ্য হ্যাটট্রিক শিরোপা জয়

ভয়েস স্পোর্টস ডেস্ক

প্রকাশঃ ৬ জুন, ২০২৬ ১২:৩১ পূর্বাহ্ন


ট্রফি হাতে ফটোসেশন শেষ। সুইমিংপুলের এক কোণে গল্পে মশগুল দুই কোচ—পিটার জেমস বাটলার ও ক্রিসপিন ছেত্রি। ক্যামেরার ঝলকানি থামতেই দুই অধিনায়ক মারিয়া মান্দা ও সঙ্গীতা বাসফোর ভক্তদের সেলফির আবদার মেটাতে ব্যস্ত। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হাসিমুখে গল্পও করলেন বেশ কিছুক্ষণ।


মারিয়া বাংলাদেশের, সঙ্গীতা ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মেয়ে। ভাষা একই বাংলা। ফলে কথার ঝুলি ফুরাতেই চায় না। ফাইনালের আগের দিন গোয়ার আকাশে যেমন বৃষ্টির ছোঁয়ায় নরম আবহ, দুই দলের খেলোয়াড়দের মাঝেও তেমনই সৌহার্দ্যের বাতাস।


কিন্তু শনিবার সন্ধ্যা ৭টায় জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামে যখন শুরু হবে সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল, তখন এই সম্প্রীতির ছবির জায়গা নেবে লড়াইয়ের উত্তাপ। মাঠে নামার পর মারিয়া ও সঙ্গীতাদের লক্ষ্য একটাই জয়।


ভারতের সামনে হারানো শিরোপা পুনরুদ্ধারের সুযোগ। আর বাংলাদেশের লক্ষ্য ইতিহাস গড়া। ২০২২ ও ২০২৪ সালের সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রেখে টানা তৃতীয়বারের মতো সাফের মুকুট নিজেদের মাথায় তুলে নেওয়া।


দুই দল একই হোটেলে থাকছে। লবিতে, খাবারের টেবিলে কিংবা আরব সাগরের তীরে হাঁটতে গিয়ে প্রায়ই দেখা হচ্ছে খেলোয়াড়দের। আড্ডা হচ্ছে, বন্ধুত্বও গড়ে উঠছে। কিন্তু ফাইনালের ৯০ মিনিটে এসব সম্পর্কের কোনো মূল্য থাকবে না। তখন মারিয়া-আফঈদা কিংবা সঙ্গীতা-গ্রেসিদের সামনে থাকবে কেবল প্রতিপক্ষকে হারানোর তাড়না।


বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার নাম মনিকা চাকমা। ডান পায়ের গোড়ালির চোট পুরোপুরি সেরে না ওঠায় ছন্দ খুঁজে পাচ্ছেন না মিডফিল্ডের প্রাণভোমরা। কোচ বাটলারও আকার-ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিয়েছেন, ভারতের বিপক্ষে মনিকার খেলার সম্ভাবনা খুবই কম।


অন্যদিকে ভারতের শক্তি বেড়েছে মনিষা কল্যাণকে পেয়ে। পেরুর ক্লাবে খেলা এই ফরোয়ার্ড ক্লাবের ছাড়পত্র না পাওয়ায় টুর্নামেন্টের প্রথম তিন ম্যাচ খেলতে পারেননি। তবু তাকে ছাড়াই ভারত মালদ্বীপকে উড়িয়ে দিয়েছে ১১-০ গোলে, বাংলাদেশকে হারিয়েছে ৩-০ ব্যবধানে। ভুটানের বিপক্ষে সেমিফাইনালে কিছুটা ঘাম ঝরাতে হলেও ১-০ গোলের জয়ে দুই আসর পর ফাইনালে জায়গা করে নেয় পাঁচবারের চ্যাম্পিয়নরা।


দেশের হয়ে ১৫ গোল করা মনিষা ফিরেছেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে। ফলে ভারতীয় শিবিরে আত্মবিশ্বাসও বেড়েছে কয়েক গুণ। সংবাদ সম্মেলনে অধিনায়ক সঙ্গীতা বাসফোরও জানিয়ে দিলেন, শুরু থেকেই বাংলাদেশকে চাপে ফেলার পরিকল্পনা তাদের।


বাংলাদেশের আক্রমণভাগ অবশ্য এবার প্রত্যাশামতো ধারালো নয়। মালদ্বীপের বিপক্ষে আনিকা রানিয়া সিদ্দিকীর ১১ সেকেন্ডের গোল আর নেপালের বিপক্ষে ঋতুপর্ণা চাকমার অসাধারণ অলিম্পিক গোলই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। অথচ দলের গোলদাতাদের তালিকায় ফরোয়ার্ডদের উপস্থিতি খুবই কম। এতে আক্রমণভাগের কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।


সমস্যা আছে মাঝমাঠেও। গত দুই আসরে বাংলাদেশের সাফল্যের বড় ভিত্তি ছিল মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ। এবার সেই আধিপত্য চোখে পড়ছে না। রক্ষণভাগেও আফঈদা খন্দকার ও কোহাতি কিসকুদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে অনিশ্চয়তা। উইং থেকে পর্যাপ্ত সহায়তা পাচ্ছেন না আনিকা। গ্রুপ পর্বে ভারতের বিপক্ষে ৩-০ গোলের পরাজয়ও মানসিকভাবে কিছুটা হলেও পেছনে টানছে দলকে।


তবে সেমিফাইনালের আগে শিউলি আজিমের মায়ের মৃত্যুর শোক পুরো দলকে এক সুতোয় বেঁধে দিয়েছে। কঠিন সেই সময় পার করে নেপালের বিপক্ষে জয় দলের আত্মবিশ্বাসও ফিরিয়ে এনেছে।


ফাইনালের আগে একদিনের বিশ্রাম শেষে মাঠে অনুশীলন করিয়েছেন বাটলার। তবে এই ইংলিশ কোচের সবচেয়ে বেশি জোর ভিডিও বিশ্লেষণে। প্রতিপক্ষের শক্তি-দুর্বলতা নিয়ে টিম হোটেলে দীর্ঘ সেশন চলছে নিয়মিত। প্রস্তুতি মাঠ নিয়ে অভিযোগ, বহিরাগতদের আনাগোনা কিংবা নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগ সবকিছুর মাঝেও দলকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করে তুলছেন তিনি।


পরিসংখ্যান অবশ্য বাংলাদেশের পক্ষে কথা বলছে না। সাফে দুই দলের নয় দেখায় ভারতের জয় ছয়টি, বাংলাদেশের দুটি। একটি ম্যাচ ড্র। চলতি আসরে ভারত এখন পর্যন্ত করেছে সর্বোচ্চ ১৫ গোল, হজম করেনি একটিও।


বাংলাদেশের পরিসংখ্যান আরও উদ্বেগের। শেষ তিন ম্যাচে পাঁচ গোল করার বিপরীতে হজম করেছে ছয়টি। ম্যাচটিও ভারতের মাঠে, যেখানে এখনো জয় পায়নি বাংলাদেশের মেয়েরা। গত দুই আসরে ভারতের বিপক্ষে যে দুটি জয় এসেছে, দুটিই নেপালের কাঠমান্ডুর দশরথ স্টেডিয়ামে।


তবু ফাইনাল বলে কথা। এখানে পরিসংখ্যানের মূল্য অনেক সময় কমে যায়। দুই কোচের কথাতেও মিল পাওয়া গেল সেটিরই। বাটলারের মতে, এটি হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ম্যাচ। ছেত্রিও মনে করেন, হারানোর ভয় ছাড়াই খেলতে পারবে বাংলাদেশ। চাপটা বরং থাকবে স্বাগতিক ভারতের ওপর।


২০১৬ সালের পর প্রথমবারের মতো সাফের ফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে দুই দল। শিলিগুড়ির সেই ফাইনালে জিতেছিল ভারত। এক দশক পর সেই স্মৃতি মুছে দেওয়ার সুযোগ এখন বাংলাদেশের সামনে। দুই দলের ডাকনামও যেন লড়াইয়ের পূর্বাভাস দেয়—বাংলাদেশ ‘বেঙ্গল টাইগ্রেস’, ভারত ‘ব্লু টাইগ্রেস’।


সুতরাং ট্রফির সামনে হাসিমুখে তোলা ছবিগুলো যতই সম্প্রীতির গল্প শোনাক, ফাইনালের বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হবে বাঘিনীদের যুদ্ধ। সেখানে বন্ধুত্ব নয়, শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে কেবল একটাই সত্য শিরোপা।


শেয়ার করুনঃ

খেলাধুলা-বিনোদন থেকে আরো পড়ুন

বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল, ভারত নারী ফুটবল দল, সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপ ২০২৬, বাংলাদেশ বনাম ভারত ফাইনাল

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ