০৫ মে ২০২৬

কৃষি / চাষাবাদ

সরকারি দামে নয়, ধান বিক্রি হচ্ছে অর্ধেক দামে, হতাশ সুনামগঞ্জের কৃষকেরা

তামিম রায়হান, সুনামগঞ্জ

প্রকাশঃ ৫ মে, ২০২৬ ৩:৪৯ অপরাহ্ন


সুনামগঞ্জে সরকারি ধান সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হলেও তার বাস্তব সুফল এখনো পৌঁছায়নি হাওরাঞ্চলের প্রান্তিক কৃষকদের কাছে। তথ্যের ঘাটতি ও মধ্যস্বত্বভোগী ফরিয়াদের দৌরাত্ম্যে অনেক কৃষক বাধ্য হচ্ছেন খলা থেকেই কম দামে ধান বিক্রি করতে। 


সরকার নির্ধারিত দরে প্রতি মণ ধান ১ হাজার ৪৪০ টাকা হলেও মাঠপর্যায়ে কৃষকরা পাচ্ছেন এর অর্ধেকেরও কম, প্রায় ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা। এতে ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন হাজারো কৃষক।


সুনামগঞ্জের দেখার হাওর পাড়ের গোবিন্দপুর গ্রামের দুই সহোদর এমরান মিয়া ও সামরান মিয়া ধারদেনা করে ১৭ বিঘা জমিতে বোরো ধান আবাদ করেছিলেন। প্রায় দেড় লাখ টাকা খরচ হলেও এখনো পুরো ফসল ঘরে তুলতে পারেননি তারা। 


তাদের মধ্যে ১০ বিঘার ধান কোনোভাবে কেটে খলায় তুললেও বাকি ৭ বিঘা জমি এখনো পানির নিচে। জমিতে জলাবদ্ধতার কারণে হারভেস্টার নামানো সম্ভব হয়নি, আবার শ্রমিকের সংকটও দেখা দিয়েছে। ফলে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে দুই ভাইয়ের।


এমরান মিয়া বলেন, “খরচ তো করলাম অনেক। কিন্তু এখন ধান শুকানোর সুযোগ নেই। বেপারীরা এসে কম দাম বলতেছে, বাধ্য হয়ে বিক্রি করতে হচ্ছে।” একই চিত্র জেলার বিভিন্ন হাওর এলাকায়। 


লক্ষণশ্রী ইউনিয়নের জানিগাঁও গ্রামের কৃষক জব্বার মিয়া বলেন, “সরকার ধান কিনবে ১৪৪০ টাকায়, এই খবরই আমাদের ঠিকমতো জানানো হয়নি। বেপারীরা এসে ৬০০–৭০০ টাকা বললেই বিক্রি করতে হয়।”


জলিলপুর গ্রামের কৃষাণী রংমালা বিবি জানান, বৃষ্টির কারণে ধান ভেজা অবস্থায় খলাতেই নষ্ট হচ্ছে। অনেক ধানে অঙ্কুরও গজিয়েছে। বেপারীরা ৭০০ টাকা দাম দিছে, আর অপেক্ষা করার উপায় নাই।”


স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি ধান সংগ্রহ শুরু হলেও প্রচারণা দুর্বল হওয়ায় অনেক কৃষক তা জানেন না। এই সুযোগে ফরিয়া ও দাদন ব্যবসায়ীরা খলা থেকেই কম দামে ধান কিনে নিচ্ছেন। আগাম দাদন (সুদে) নেওয়া কৃষকরাও বাধ্য হচ্ছেন কম দামে ধান তুলে দিতে।


তবে জেলা খাদ্য বিভাগ বলছে, কৃষকদের সচেতন করতে মাইকিংসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।


এদিকে কৃষকদের দাবি, শুধু প্রচারণা নয়—ধান ক্রয়ের প্রক্রিয়া আরও সহজ করতে হবে এবং মাঠপর্যায়ে মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। তা না হলে কৃষকের ঘামে উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হওয়ার এই চিত্র বদলাবে না।


জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা বি এম মুশফিকুর রহমান জানান, এ বছর জেলায় ২১ হাজার ৩৪৯ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।


কৃষকরা লোকাল সাপ্লাই ডিপোতে ধান এনে শুকিয়ে সরাসরি সরকারি গুদামে দিতে পারবেন। আমরা সরাসরি কৃষকের কাছ থেকেই ধান সংগ্রহ করছি।”


শান্তিগঞ্জ উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা মো. আবদুর রব বলেন, ধানের আর্দ্রতা ১৪ শতাংশের মধ্যে থাকতে হবে। না হলে ধান গ্রহণ করা হবে না, এজন্য নমুনা পরীক্ষা বাধ্যতামূলক।


জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সুনামগঞ্জ জেলায় চলতি মৌসুমে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত ১ লাখ ৪৭ হাজার ৩৭৩ হেক্টর জমির ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে, যা মোট আবাদের ৬৫ দশমিক ৯৩ শতাংশ। এর মাঝে হাওর এলাকায় ১ লাখ ২৭ হাজার ৬৯৩ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে অন্যদিকে নন-হাওর এলাকায় ১৯ হাজার ৬৮০ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে। জেলায় প্রায় ২০ হাজার ১৬০ হেক্টর জমি প্লাবিত হয়েছে।


শেয়ার করুনঃ

কৃষি থেকে আরো পড়ুন

সুনামগঞ্জ ধান, হাওর কৃষক, সরকারি ধান সংগ্রহ, ধানের দাম, হতাশ কৃষক

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ