৩০ এপ্রিল ২০২৬

মুক্তমত / সাক্ষাৎকার

‘যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন হলে সিলেটই পাল্টে দিবে অর্থনীতির চাকা’

সিলেট ভয়েস

প্রকাশঃ ১৭ ডিসেম্বর, ২০২৫ ১০:৪৫ অপরাহ্ন


সিলেটের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ফালাহ উদ্দিন আলী আহমেদের সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে উঠে এলো নির্বাচন-পরবর্তী সরকারের কাছে স্থানীয় ব্যবসায়ী সমাজের গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশা ও দাবি। বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক রেমিট্যান্স থাকা সত্ত্বেও কেন সিলেটে শিল্পায়ন হচ্ছে না? কী কী বাধা পার করতে হচ্ছে উদ্যোক্তাদের?

  

এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় ফালাহ উদ্দিন আলী আহমেদ সিলেটের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল অন্তরায়গুলো তুলে ধরেন এবং সরকারের কাছে জরুরি পদক্ষেপের আহ্বান জানান। সিলেট ভয়েস কার্যালয়ে সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন সিলেট ভয়েস সম্পাদক দ্বোহা চৌধুরী


সিলেট ভয়েস: বিগত অর্থবছরে সিলেটে ৩১ হাজার ৪১ কোটি টাকার রেমিটেন্স এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে আমরা জানি যে, সিলেট আসলে ঠিক রেমিটেন্স নির্ভর একটি বড় অঞ্চল হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। এখানে ঠিক ওইভাবে শিল্প গড়ে ওঠেনি বা শিল্পনগরী হিসেবে গড়ে ওঠেনি। তো এই বিষয়টা কেন? এত টাকার রেমিটেন্স আমাদের এখানে আসছে, প্রায় প্রতিবছর ধরেই সেই শিল্প হিসেবে বড় বড় শিল্প-প্রতিষ্ঠানগুলো সিলেট অঞ্চলে কেন গড়ে ওঠেনি বলে আপনি মনে করেন?

 

ফালাউদ্দিন আলী আহমেদ: আপনি যেটা বলছেন, যে এত রেমিট্যান্স আসার পরেও কোন উন্নয়ন হচ্ছে না। এটার পিছনে আসল কারণ হচ্ছে সিলেট নিয়ে যারা চিন্তাভাবনা করবেন সেই সমস্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সিলেট নিয়ে কোন কাজ করছেন না। আমি বলব যে, উনাদের অতিরিক্ত জ্ঞানের কারণে হয়তো করতে পারতেছেন না, না অন্য কোন কারণে আমি এটা বুঝে উঠতে পারতেছি না। আমি যখন সিনিয়র সহ-সভাপতি ছিলাম তখন আমরা চারজন মন্ত্রীকে নিয়ে সিলেটে দাওয়াত করেছিলাম। সিলেটের উন্নয়ন নিয়ে ছোট্ট একটা আবেদন করেছিলাম যে আমাদের কার্গো চালু হয়েছে, সিলেটের রোড দিয়ে আমরা একটা ওয়ারহাউস স্থাপন করব। এয়ারপোর্টের মধ্যে…. আপনারা শুধু একজন সরকারি কর্মকর্তাদের চারজন প্রভাবশালী মন্ত্রীকে নিয়ে বসেও কাজ করতে পারি নাই। এটা হয়তো সিলেট বিদ্বেষীর কারণে অথবা সিলেটের নিয়ে কণ্ঠস্বর উঠানোর মত কোন ব্যক্তি নাই। সিলেটে কিন্তু অনেক সমস্যা, যেমন- রেল সমস্যা, রাস্তাঘাটের সমস্যা, হাইওয়ে সমস্যা, নদীপথে সমস্যা, বিমান পথে সমস্যা, কোন দিকটা উন্নত আছে দেখেন? নদীপথ হচ্ছে একটা সহজলভ্য খরচ যেকোন শিল্প-প্রতিষ্ঠান করার ক্ষেত্রে কেরিংটা হচ্ছে একটা বড় ক্ষেত্র।

 

সিলেট ভয়েস: সিলেটের শিল্পায়নের প্রধান বাধা কী সরকার, স্থানীয় নেতৃত্ব, ব্যবসায়ীদের অনীহা, আমলাতন্ত্র, রাজনৈতিক কাঠামো নাকি অবকাঠামোগত সমস্যা?

 

ফালাউদ্দিন আলী আহমেদ: সেটার জন্য আমি দায়ী করব আমাদের সিলেটের কর্ণদারদেরকে যারা সিলেটকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন ফোরামে রাস্তাঘাট উন্নয়ন করার জন্য, রেল উন্নয়ন করার জন্য, বিমান চলাচলের রোডগুলো উন্নয়ন করার জন্য বহুবার বহু মন্ত্রণালয়ে আমাদের চেম্বার অফ কমার্স নিয়েও কথা বলেছি। আল্টিমেটলি যে জায়গায় পৌঁছার পরে যেখানে সরকারের কাছে ট্রান্সফার হওয়ার কথা ছিল সরকারকে বাধ্য করা উচিত ছিল, এটা কেন করবেন না, গুরুত্ব বেশি কেন হবে না? আজকে আপনি দেখবেন, কুড়িগ্রামের রাস্তা দেশের মধ্যে ১৭ নম্বর। রেভিনিউ’র দিক দিয়ে পিছিয়ে ঢাকা, চট্টগ্রামের পরেই সিলেটে কিন্তু হাই রেভিনিউ কালেকশন হচ্ছে। কিন্তু সিলেটের যে কথা বলার লোক নাই দেখেই এই সমস্ত সমস্যা পড়তেছে। তাই আমি বলব, আর কারো দোষ নাই আমাদের যারা কথা বলার কথা ছিল, কর্ণদার ছিল, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিল উনারাই সর্বপ্রথম দায়ী।

 

সিলেট ভয়েস: জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে নির্বাচিত যে সরকার আসবেন সেই সরকার যদি বলে যে, আমরা একটা মেগা প্রকল্প নিব সিলেটের জন্য তো সেই মেগা প্রকল্পটি আসলে কি হওয়া উচিত। আপনার কি মনে হয় যে, একটা প্রকল্প নিব বড় প্রকল্প সিলেটকে বদলে দিতে পারে? 

 

ফালাউদ্দিন আলী আহমেদ: সিলেটে প্রথম যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন করুক। দেখবেন সিলেটে শিল্প বিপ্লব ঘটে যাবে। ক্ষুদ্র মাজারী শিল্পের দ্রুত বিকাশ ঘটবে যেটা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখার মত উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে এটা। আমার বিশ্বাস, এই ধরনের ধারণক্ষমতা ও সক্ষমতাও আছে।

 

সিলেট ভয়েস: যেমন আমরা প্রথমে বলছিলাম যে, প্রবাসীদের যে রেমিটেন্স আসে সে ক্ষেত্রেতো তাহলে আরেকটা খুব গুরুত্বপূর্ণ জিনিস চলে আসছে যে, প্রবাসী বিনিয়োগের জন্য বিশেষ কোন নীতিমালার কী প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় আপনার?

 

ফালাউদ্দিন আলী আহমেদ : প্রবাসীদের নীতিমালা, যেটা আমাদের বাংলাদেশে আছে সেটা আসলে প্রবাসীদের বিনিয়োগের উপর যথেষ্ট সহায়ক না। যেমন, প্রবাসীরা ডলারে আপনার দেশে বিনিয়োগ করবে, ডলারের ফেরত নিবে। সেক্ষেত্রে ওনাদেরকে কনভার্ট করে এটারে টাকা করে ফেলেন। এক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের অনেকটা অনিহা আছে। অন্যান্য দেশ যেমন ইন্ডিয়া বলেন, ফ্রান্স বলেন, ইতালি বলেন, মালয়েশিয়া বলেন এসব দেশে যে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য সমস্ত নীতিমালা আছে, জন্য সে সমস্ত নীতিমালা অবশ্যই আপনি প্রয়োগ করতে পারবেন অথবা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা আসা খুব কঠিন হয়ে যাবে। আমরা এখন বলি যে, না আপনাদের মোটেই টাকা লাগবে না এদেশে প্রচুর টাকা আছে আপনারা শুধু প্রযুক্তি নিয়ে আসেন, অভিজ্ঞতা নিয়ে আসেন- এগুলোই আমাদের দরকার।

 

সিলেট ভয়েস: সিলেটের সম্ভাবনাময় চারটি খাত পর্যটন, কৃষিপ্রক্রিয়াজাতকরণ, চা শিল্প ও আইটি এর মধ্যে কোনটিকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত? অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ খাত কী বিবেচনায় আসে?

 

ফালাউদ্দিন আলী আহমেদ: এই চারটা খাতের মধ্যে সবগুলোই খুব গুরুত্বপূর্ণ। আইটির উপর অনেক এগিয়ে যাচ্ছে আমাদের ছেলেরাও অনেক এগিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু আমরা এদেরকে সঠিক প্লাটফর্ম তৈরি করে দিতে পারছি না। আমাদের যে আইটি সেন্টার আছে, সঠিক নীতিমালা না থাকার কারণে এখানে  স্থানীয় বিনিয়োগকারীরা এগিয়ে আসতেছে না। আমরা চেম্বার অফ কমার্সে বলেছিলাম যে, আপনারা ৩ বছর ট্যাক্স ফ্রি রাখেন বা রাজস্ব ফ্রি রাখেন, পরের তিন বছর ট্যাক্স শুরু করবেন। পর্যটন খাতে যেমন সুস্পষ্ট নীতিমালা না থাকার কারণে আমাদের পর্যটন শিল্পটা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। আপনি আজকে রাতারগুলোর দিকে যান, দেখবেন কিছু কিছু জায়গায় রাস্তা আছে ওয়ান ওয়ের মত, কিন্তু দুইটা গাড়ি আসা যাওয়ার খুবই মারাত্মক। সেখানে ওয়াশরুম নাই, পরিষ্কার স্যানিটেশন ব্যবস্থা নাই, মানসম্পন্ন রেস্টুরেন্টগুলো নাই। সরকার এমন কিছু নীতিমালা করবে সরকারের লোকেরা এতে জড়িত হয়ে যায়। সেই সবকিছু করবে, সেই সবকিছু খাবে এরকম অবস্থা। সরকারকে দেশের প্রতি চিন্তাভাবনা করে দেশকে এগিয়ে নিতে হলে এ সমস্ত পিপিপিতে যোগ্য মানুষদেরকে ডেকে দিতে হবে। কৃষিভিত্তিক-কে সিলেটে বিপ্লব করার মত সক্ষমতা ছিল। পরিমাণ অব্যবহৃত জমি আছে যা বিশ্বের আর কোথাও নাই, বাংলাদেশের কোথায় নাই। কিন্তু এগুলো ব্যবহার করছি না কেন। সরকার সেটা নিশ্চিত করবে নিশ্চিত করতে হবে যে, হ্যা আমি আপনাকে তিন মাসের মধ্যে জমি ফেরত দিতে বাধ্য থাকব। কিন্তু কেউ ফেরত দেয় না, কেউ খালি জমি কাউকে ব্যবহার করতে দিচ্ছে না।

 

সিলেট ভয়েস: এখন যারা প্রার্থী হয়েছেন সিলেটের ১৯টি আসনে এই প্রার্থীদের ব্যাপারে আপনার মূল্যায়নটা কী, তারা সেরকম জায়গাটাতে কী অবদান রাখতে পারবেন আমাদের সিলেটের জন্য। তাদের যোগ্যতার জায়গাটাকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?

 

ফালাউদ্দিন আলী আহমেদ: এখন আসলে যারা আছেন তাদের পূর্ব অভিজ্ঞতা খুব একটা বেশি না। রাজনীতির খুব বেশি দিনের না খুব অভিজ্ঞ না খুব বড় সেমিনার বা খুব অর্থনীতির দক্ষবিদ এরকম না। আমাদের দেশে আসলে টোটালি মানদণ্ডই কমে চলে আসছে। প্রতিটা সেক্টর ব্যবসায়ী বলেন, রাজনীতিবিদ বলেন, সব সেক্টরেই যোগ্য মানুষের অভাব দেখা যাচ্ছে। তারপরেও খুব খারাপ না, যারা এবার সিলেট থেকে প্রার্থী রয়েছেন বা বিভিন্ন আসন থেকে যারা প্রার্থী হয়েছেন, খুব খারাপ বলা যাবে না, মোটামুটি মাজারি লেভেলের আছেন। আশা করি, তারা দুই একবার সংসদ সদস্য হয়ে গেলে তাদের অভিজ্ঞতা হবে। আমি সেখানে গেলে আমাদের সিলেটের দাবি-দাবাগুলো নিয়ে বলি যে, আমাদের কমিউনিকেশনের ব্যাপারে আপনার চিন্তা কি? আমাদের এই যে সিলেটে এয়ারপোর্টে একটা ওয়ারহাউস স্থাপন করা যাচ্ছে না এগুলো নিয়ে আপনার কি চিন্তা, আমাদের পর্যটন খাত নিয়ে কি চিন্তা, আমাদের কৃষি খাত নিয়ে আপনাদের কি চিন্তা। তখন উনাদের যে অভিব্যক্তি প্রকাশ করে তখনই জনগণ বুঝে ফেলে যে কে কতটুক যোগ্য লেভেলে। তো এগুলো শুনলেই আপনারা বুঝতে পারবেন যে আমাদের লেভেলটা কতটুকু আছে।

 

সিলেট ভয়েস: আমরা একটু শেষের দিকে আসছি যে, নতুন সরকার গঠনের পরে পরবর্তী পাঁচ বছর একটা সরকারের প্রথম সময়টাতে দৃশ্যমান কি কি পরিবর্তন হলে আপনি এই সরকারকে মানে পরবর্তী সরকারকে সফল বলে মনে করতে পারেন?

 

ফালাউদ্দিন আলী আহমেদ: সিলেটের দৃশ্যমান পরিবর্তন প্রথমে কমিউনিকেশন ডেভেলপমেন্ট অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়ে আছে। যদি কমিউনিকেশন ডেভেলপমেন্ট হয়ে যায় বেসরকারি খাতে নিজে নিজে অর্থ চাকা সমৃদ্ধ করতে পারবে। এটা আপনাকে আমি আনডাউট ব্লাঙ্ক চেক সিগনেচার করতে পারি, কোন দ্বিধাদ্বন্দ নাই। শত শত ইন্ডাস্ট্রি মুক্তবড়ে পড়ে আছে শুধু কমিউনিকেশনের অভাবে। আজকে দেখেন, লন্ডন থেকে একটা ছেলে তার বাবার জানাজায় এসে জানাজা পড়তে পারে কিন্তু ঢাকা থেকে একটা ছেলে সিলেট এসে জানাজায় অংশগ্রহণ করতে পারে না। ১৮-১৯ ঘন্টা লাগে। সব মিলিয়ে সরকার সফল হবে যদি তারা অর্থনৈতিক মুক্তি নিয়ে আসতে পারে,  অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিয়ে আসে। প্রত্যেকেই প্রত্যেকের দায়িত্ব কাজ করতে হবে। ব্যবসায়ী ইনস্টিটিউটগুলো ব্যবসায়ীদের দিয়ে করতে হবে, সরকারি কর্মকর্তা দিয়ে ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান চালালে সেটা কখনো দেশের মঙ্গল হবে না। তাই অচিরেই আমার দাবি যে, বাংলাদেশের যতগুলো চেম্বার অফ কমার্স সরকারি কর্মকর্তা দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে এদেরকে সরিয়ে ব্যবসায়ীদের হাতে তুলে দেন, সঠিক নির্বাচন দেন। আপনারা করা নির্বাচন করেন সঠিকভাবে করেন।


শেয়ার করুনঃ

মুক্তমত থেকে আরো পড়ুন

মুক্তমত, সাক্ষাৎকার, ব্যবসা-বাণিজ্য, সিলেট, উন্নয়ণ প্রকল্প

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ