শাকিলা ববি
নারীর উপর চাপিয়ে দেওয়ার সংস্কৃতিকে আরও পাকাপোক্ত করার চেষ্টা চলছে
রাসেল আহমদ
প্রকাশঃ ১২ আগস্ট, ২০২৬ ৩:২২ অপরাহ্ন
এখনো সুনামগঞ্জের ধোপাজান নদীর বুকে প্রতিদিন ভোরের আলো ঝিলমিল করে। দূর থেকে নদীটিকে আগের মতোই শান্ত মনে হয়। কিন্তু কাছে গেলেই বোঝা যায়, বদলে গেছে তার স্রোত, বদলে গেছে তার অর্থনীতি, সমাজ এবং মানুষের সঙ্গে নদীর সম্পর্কও। যে নদী একসময় হাজারো শ্রমজীবী মানুষের জীবিকার ভিত্তি ছিল, সেটি আজ ক্রমেই পুঁজি, প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণের প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র। নদী এখনো আছে, বালুও আছে; কিন্তু নদীনির্ভর মানুষ ক্রমশ নদী থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন।
এই নদীকেন্দ্রিক জীবনব্যবস্থার অন্যতম প্রতীক ছিল বারকি- হাওরাঞ্চলের লম্বা, সরু কাঠের নৌকা। এটি শুধু বালু বা পাথর বহনের বাহন ছিল না; ছিল একটি অর্থনীতি, একটি সংস্কৃতি এবং বহু পরিবারের জীবিকার ভিত্তি। একটি বারকিকে ঘিরে গড়ে উঠত কয়েকটি পরিবারের আয়, পারস্পরিক সহযোগিতা ও সামাজিক সম্পর্ক। আজ সেই বারকি বিলুপ্তপ্রায়। কারণ নদীর অর্থনীতিতে শ্রমের জায়গা দখল করেছে পুঁজি, মানুষের জায়গা নিয়েছে যন্ত্র।
প্রবীণ বারকি শ্রমিক জাহের মিয়ার একটি কথাই এই পরিবর্তনের সারমর্মকে তুলে ধরে- "আমরা নদী থেকে জীবিকা তুলতাম, নদীকে কষ্ট দিতাম না। এখন নদীকে মেরে বালু তোলা হয়।" এটি কেবল ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ নয়; বাংলাদেশের নদী-সম্পদ ব্যবস্থাপনার দীর্ঘ রূপান্তরের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।
একসময় ধোপাজান, যাদুকাটা, চলতি নদ, রক্তি, মরা চেলা, সোনালি চেলা,চেঙ্গের খাল, গুয়াইন, সারী, লোভা, পিয়াইন, ডাউকি, ধলাই, বৌলাই- দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের এসব নদীর অর্থনীতি ছিল মানুষকেন্দ্রিক। বালু-পাথর উত্তোলনের প্রতিটি ধাপে শ্রম ছিল প্রধান শক্তি। নদীর সম্পদ স্থানীয় বাজার সচল রাখত, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করত এবং একটি বিস্তৃত অর্থনৈতিক চক্র গড়ে তুলত। নদীকে ব্যবহার করা হতো, শোষণ করা হতো না।
পরিবর্তন শুরু হয় যখন নদীকে জীবন্ত প্রতিবেশব্যবস্থা নয়, রাজস্ব আহরণের উৎস হিসেবে দেখা শুরু হয়। আশির দশকে ইজারা ব্যবস্থার বিস্তারের সঙ্গে স্থানীয় মানুষের প্রথাগত অধিকার দুর্বল হতে থাকে। সম্পদের সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে যুক্ত জনগোষ্ঠীকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বাইরে সরিয়ে দিলে সম্পদ ব্যবস্থাপনা ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে পরিণত হয়। হাওরের নদীগুলোর ক্ষেত্রেও ঘটেছে সেই রূপান্তর।
পরবর্তীকালে এই অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক প্রভাব, মধ্যস্বত্বভোগিতা ও ক্ষমতার প্রতিযোগিতা। ফলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছেন অনেক সময় এমন ব্যক্তিরা, যাঁদের সঙ্গে নদীর কোনো প্রত্যক্ষ শ্রমসম্পর্ক নেই। অন্যদিকে যাঁদের শ্রমে নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতি গড়ে উঠেছিল, তাঁরাই সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত। উৎপাদনের প্রকৃত অংশীদার ও মুনাফার প্রকৃত ভোগকারীর মধ্যে এই বৈষম্য স্থানীয় অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিকে দুর্বল করছে।
এই বৈষম্যকে আরও ত্বরান্বিত করেছে দুইহাজার সালের দিকে ড্রেজার প্রযুক্তির বিস্তার। প্রযুক্তি উন্নয়নের অপরিহার্য উপাদান, কিন্তু তার ব্যবহার যদি পরিবেশগত ভারসাম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচারকে উপেক্ষা করে, তবে সেটি অগ্রগতির নয়, বৈষম্যের হাতিয়ার হয়ে ওঠে। ড্রেজার অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ বালু উত্তোলন করলেও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, তলদেশ ও তীরের স্থিতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়; একই সঙ্গে শত শত বারকি শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েন।
অতএব হাওরের নদীসংকট কেবল পরিবেশগত নয়; এটি শ্রমবাজার, সম্পদের ন্যায্য বণ্টন এবং রাষ্ট্রের উন্নয়ন-দর্শনেরও সংকট। কারণ যে উন্নয়ন মানুষকে তার ঐতিহ্যগত জীবিকা থেকেই বিচ্ছিন্ন করে, সেই উন্নয়নের সাফল্য নতুন করে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
নদীর এই রূপান্তরের কেন্দ্রে শুধু ড্রেজার নয়; রয়েছে একটি অসম রাজনৈতিক অর্থনীতি। নদী থেকে সম্পদ আহরণের প্রতিটি স্তরে শ্রমিকের অংশ কমেছে, আর বেড়েছে ইজারাদার, মধ্যস্বত্বভোগী ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ। ফলে প্রাকৃতিক সম্পদ স্থানীয় সমৃদ্ধির বদলে সীমিত কয়েকজনের সম্পদ সঞ্চয়ের উপকরণে পরিণত হয়েছে। এতে অর্থনৈতিক বৈষম্যের পাশাপাশি রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার আস্থাও ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে।
এই বাস্তবতায় প্রশাসনের ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে। অবৈধ বালু উত্তোলন ও অনিয়ন্ত্রিত ড্রেজার ব্যবহারের বিরুদ্ধে আইন থাকলেও তার নিরপেক্ষ প্রয়োগ প্রায়ই হয়না। স্থানীয় মানুষের অভিযোগ, প্রভাবশালী স্বার্থগোষ্ঠীর কারণেই আইন কার্যকর হয় না। আইনের শাসন যখন সমানভাবে কার্যকর হয় না, তখন প্রাকৃতিক সম্পদও ধীরে ধীরে ক্ষমতার সম্পদে পরিণত হয়।
ধোপাজান বা যাদুকাটার প্রশ্ন তাই কেবল একটি নদীর প্রশ্ন নয়; এটি সুশাসন, ন্যায়ভিত্তিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির প্রশ্ন। সম্পদের মালিক রাষ্ট্র, শ্রম মানুষের, অথচ মুনাফা যদি সীমিত কয়েকজনের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, তবে সেটি শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; এটি নীতি ও ক্ষমতার সংকট।
বারকির মানুষের অভিজ্ঞতা আমাদের উন্নয়নের ধারণাকেও নতুন করে ভাবতে শেখায়। উন্নয়ন কেবল অবকাঠামো, রাজস্ব বা যন্ত্রের দক্ষতা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। উন্নয়ন তখনই অর্থবহ, যখন তা মানুষের মর্যাদা রক্ষা করে, কর্মসংস্থান নিশ্চিত করে এবং প্রাকৃতিক সম্পদের স্থায়িত্ব বজায় রাখে।
কিন্তু সবচেয়ে বড় ক্ষয়টি অর্থনীতির পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না। হারিয়ে যাচ্ছে একটি নদীকেন্দ্রিক সংস্কৃতি। বারকি ছিল শ্রমের মর্যাদা, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং প্রজন্মান্তরে সঞ্চারিত দক্ষতার প্রতীক। একটি পেশা বিলুপ্ত হলে শুধু আয় নয়; হারিয়ে যায় মানুষের স্মৃতি, ঐতিহ্য এবং আত্মপরিচয়েরও একটি অংশ।
এই সংকট তাই কোনো বিচ্ছিন্ন আঞ্চলিক সমস্যা নয়; এটি বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনার বৃহত্তর প্রতিচ্ছবি। একই প্রশ্ন নদী, বন, পাহাড় ও জলাভূমির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য- প্রাকৃতিক সম্পদের প্রকৃত উপকারভোগী কে? স্থানীয় জনগোষ্ঠী, নাকি সংগঠিত পুঁজি ও ক্ষমতার জোট?
সমাধানও নাগালের বাইরে নয়। নদী ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন ছাড়া বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া যাবে না। অবৈধ ড্রেজারের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ অভিযান পরিচালনা করতে হবে। ইজারা ব্যবস্থাকে এমনভাবে সংস্কার করতে হবে, যাতে স্থানীয় শ্রমজীবী মানুষের অংশীদারত্ব বাস্তব অর্থে নিশ্চিত হয়। একই সঙ্গে নদীকে শুধু রাজস্বের উৎস নয়, জীবন্ত প্রতিবেশব্যবস্থা এবং স্থানীয় অর্থনীতির ভিত্তি হিসেবে দেখতে হবে।
এখানে রাষ্ট্রেরও একটি নৈতিক দায় রয়েছে। নদী কেবল সরকারের সম্পত্তি নয়; এটি জনগণের অভিন্ন প্রাকৃতিক উত্তরাধিকার। সেই উত্তরাধিকার সংরক্ষণ এবং নদীসম্পদের ন্যায্য সুফল নদীতীরের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
হাওরাঞ্চলের সম্পদ ও শ্রমকেন্দ্রীক নদীগুলোকে রক্ষা করা মানে শুধু পরিবেশ সংরক্ষণ নয়; এটি ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতি, শ্রমের মর্যাদা এবং স্থানীয় মানুষের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার লড়াই। অন্যথায় বারকি হয়তো একদিন জাদুঘরের নিদর্শন হয়ে থাকবে, আর ইতিহাস লিখবে- নদী শুকিয়ে যায়নি, শুকিয়ে গিয়েছিল মানুষের বিবেক।
লেখক: কলামিস্ট, সাংবাদিক ও জনপ্রতিনিধি।
[সিলেট ভয়েস-এ প্রকাশিত অভিমত, মতামত, কলাম ও চিঠিপত্র একান্তই লেখকের নিজস্ব।]