অধ্যাপক মোঃ শাহাদত হোসেন
ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ : একটি বিশ্লেষণ
রাসেল আহমদ
প্রকাশঃ ৬ জুন, ২০২৬ ৬:২৯ অপরাহ্ন
পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সাধারণ সম্পাদক পীযুষ পুরকায়স্থ টিটু শোকাহত কণ্ঠে বলেছিলেন, "আমাদের জন্মই যেন আজন্ম পাপ।" এই একটি বাক্যের মধ্যে যেন টাঙ্গুয়ার হাওরপাড়ের মানুষের দীর্ঘদিনের বেদনা, ক্ষোভ, অসহায়ত্ব এবং রাষ্ট্রীয় অবহেলার ইতিহাস জমাট বেঁধে আছে। তাঁর এই মর্মস্পর্শী উচ্চারণের সঙ্গে একমত না হয়ে উপায় নেই।
বিশ্ব পরিবেশ দিবসে যখন পৃথিবীর নানা দেশে মানুষ পরিবেশ সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী নির্মাণের নতুন নতুন তত্ত্ব, পরিকল্পনা ও অঙ্গীকার নিয়ে ব্যস্ত; যখন আন্তর্জাতিক সম্মেলন, সেমিনার, প্রদর্শনী ও আলোচনা সভায় পরিবেশ রক্ষার প্রতিশ্রুতি উচ্চারিত হচ্ছে; তখন টাঙ্গুয়ার হাওরের মানুষকে এক শিশুর নিথর দেহ কাঁধে বহন করতে হয়েছে। আমরা পরিবেশ রক্ষার স্লোগান শুনেছি, কিন্তু আমাদের পরিবেশ আমাদের শিশুদের নিরাপদ রাখতে পারেনি। আমরা পারিনি।
আট বছরের শিশু সৌম্যতা সরকার নিঝুমের মৃত্যু কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়; এটি আমাদের উন্নয়ন-দর্শন, পরিবেশ-ব্যবস্থাপনা এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধের নির্মম ব্যর্থতার প্রতীক। যে জলাভূমিকে আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ রামসার সাইট হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, যে হাওরকে রক্ষার জন্য একের পর এক আইন, নীতিমালা ও প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে, সেই হাওরেই একটি শিশুর জীবন নিরাপদ থাকলো না। এই মৃত্যু তাই কেবল একটি পরিবারের শোক নয়; এটি পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য আত্মসমালোচনার বিষয়।
বিশ্ব পরিবেশ দিবসে টাঙ্গুয়ার হাওর আমাদের সামনে এমন এক প্রশ্ন তুলে ধরেছে, যার উত্তর এড়িয়ে যাওয়ার আর কোনো সুযোগ নেই- প্রকৃতিকে ধ্বংস করে, জলাভূমিকে বাণিজ্যিক বিনোদনকেন্দ্রে পরিণত করে এবং পরিবেশগত সতর্কতাকে উপেক্ষা করে আমরা আসলে কোন উন্নয়নের পথে হাঁটছি?
নিঝুম আর ফিরে আসবে না। কিন্তু তার মৃত্যু আমাদের বাধ্য করছে টাঙ্গুয়ার হাওরের বর্তমান বাস্তবতা, অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন, পরিবেশগত অবক্ষয় এবং একটি আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমির বিপন্ন ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবতে।
টাঙ্গুয়ার হাওরকে ১৯৯৯ সালে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করা হয়। ২০০০ সালে এটি আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি হিসেবে রামসার সাইটের মর্যাদা লাভ করে।
সাম্প্রতিক সময়ে প্রণীত হয়েছে "টাঙ্গুয়ার ও হাকালুকি হাওর সুরক্ষা আদেশ-২০২৫"। কাগজে-কলমে সুরক্ষার এই স্তরগুলো দেখে মনে হতে পারে, টাঙ্গুয়ার হাওর বাংলাদেশের সবচেয়ে সুরক্ষিত জলাভূমিগুলোর একটি। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
আজ টাঙ্গুয়ার হাওর একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত, আন্তঃসীমান্ত দূষণ, জীববৈচিত্র্যের অবক্ষয়, জলজ উদ্ভিদের বিলুপ্তি, বনাঞ্চল সংকোচন এবং অনিয়ন্ত্রিত পর্যটনের বহুমাত্রিক চাপে জর্জরিত। অথচ এসব সংকট মোকাবিলার পরিবর্তে হাওরকে ক্রমেই একটি বাণিজ্যিক পর্যটনপণ্যে রূপান্তর করা হচ্ছে।
টাঙ্গুয়ার হাওরের প্রকৃত পরিচয় কোনো পর্যটনকেন্দ্র নয়। এটি বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলজ বাস্তুতন্ত্র। প্রায় ১০০ বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত এই জলাভূমি দেশের অন্যতম বৃহৎ মাছের প্রজননক্ষেত্র। শীতকালে হাজার হাজার পরিযায়ী পাখির নিরাপদ আশ্রয়স্থল। হিজল, করচ, বরুণ, নলখাগড়া, শাপলা, শালুকসহ অসংখ্য জলজ উদ্ভিদ ও বৃক্ষরাজির ওপর নির্ভর করে এখানে গড়ে উঠেছে এক অনন্য জীববৈচিত্র্য।
এই কারণেই টাঙ্গুয়ার হাওর আন্তর্জাতিক রামসার সাইট হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। রামসার কনভেনশনের মূল দর্শন হলো "Wise Use" -অর্থাৎ এমন ব্যবহার, যা জলাভূমির পরিবেশগত চরিত্র অক্ষুণ্ণ রেখে মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করবে। অন্যদিকে ইসিএ ঘোষণার উদ্দেশ্য হলো পরিবেশগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাকে অতিরিক্ত চাপ থেকে রক্ষা করা।
সুতরাং রামসার নীতিমালা কিংবা ইসিএ ঘোষণার কোনোটিই অনিয়ন্ত্রিত, উচ্চশব্দনির্ভর, বর্জ্যসৃষ্টিকারী বাণিজ্যিক পর্যটনকে সমর্থন করে না। কিন্তু বাস্তবে টাঙ্গুয়ার হাওরে যা ঘটছে, তা এই দর্শনের সম্পূর্ণ বিপরীত।
প্রতিদিন অসংখ্য ইঞ্জিনচালিত নৌযান ও বিলাসবহুল হাউজবোট হাওরের বুক চিরে চলাচল করছে। উচ্চক্ষমতার সাউন্ড সিস্টেমে দিনরাত চলছে গান-বাজনা। প্লাস্টিক, পলিথিন, কাঁচের বোতল, খাবারের প্যাকেট এবং মানববর্জ্য ছড়িয়ে পড়ছে হাওরের পানিতে। মাছের প্রজনন মৌসুমেও অব্যাহত থাকছে শব্দদূষণ ও নৌযানের চাপ।
গবেষকেরা বহুবার সতর্ক করেছেন যে, ইঞ্জিনচালিত নৌযানের শব্দ মাছের স্বাভাবিক প্রজনন প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে। ডিম ছাড়ার পরিবেশ নষ্ট হয়, জলজ প্রাণীর আচরণে পরিবর্তন আসে এবং দীর্ঘমেয়াদে পুরো বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর প্রভাব শুধু পরিবেশে নয়; মৎস্যসম্পদ, কৃষি এবং স্থানীয় অর্থনীতিতেও পড়ে।
পরিবেশগত ক্ষতির পাশাপাশি সামাজিক ও আইনশৃঙ্খলাজনিত উদ্বেগও বাড়ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পর্যটনের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে মাদকসেবন ও মাদক বাণিজ্যের ঘটনাও বৃদ্ধি পেয়েছে। বিস্তীর্ণ জলরাশি ও সীমিত নজরদারির সুযোগে অনেক এলাকায় নিয়ন্ত্রণহীন কর্মকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে হাউজবোটকেন্দ্রিক প্রতারণা, নিরাপত্তাহীনতা, পর্যটকদের মালামাল চুরি এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের অভিযোগও সামনে এসেছে।
প্লাস্টিক দূষণ এখন টাঙ্গুয়ার হাওরের অন্যতম বড় সংকট। পর্যটকদের ফেলে যাওয়া বর্জ্য শুধু পরিবেশের সৌন্দর্য নষ্ট করছে না; বরং মাছ, পাখি এবং জলজ উদ্ভিদের অস্তিত্বের জন্যও হুমকি হয়ে উঠছে। মদের বোতল ও ভাঙা গ্লাস ছড়িয়ে পড়ছে কৃষিজমি ও চলাচলের পথে। ফসলি জমিতে কাজ করতে গিয়ে আহত হচ্ছেন কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষ। যে মানুষগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে হাওরের সঙ্গে সহাবস্থান করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন, তারাই আজ তথাকথিত উন্নয়নের সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছেন।
হাওরের বৃক্ষরাজিও রক্ষা পাচ্ছে না। হিজল, করচ ও বরুণসহ সংবেদনশীল বৃক্ষের ডালপালা ভাঙা, নৌযান ভেড়ানোর জন্য গাছের ক্ষতি করা এবং পর্যটকদের অসচেতন আচরণে উদ্ভিদজগৎ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অথচ এই বৃক্ষরাজিই হাওরের জীববৈচিত্র্যের অন্যতম ভিত্তি।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো স্থানীয় সমাজ ও সংস্কৃতির ওপর প্রভাব। হাওরপাড়ের মানুষের জীবনধারা, মূল্যবোধ ও সামাজিক রীতিনীতির সঙ্গে বাণিজ্যিক পর্যটনের সংঘাত দিন দিন বাড়ছে। প্রকাশ্য অশালীন আচরণ, উচ্চ শব্দে রাতভর উল্লাস, স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি অবজ্ঞা এবং নিয়ন্ত্রণহীন বিচরণ সামাজিক অস্বস্তি সৃষ্টি করছে। উন্নয়নের নামে যদি একটি অঞ্চলের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে তাকে টেকসই উন্নয়ন বলা যায় না।
টাঙ্গুয়ার হাওরের সংকট আরও গভীর করেছে ভারতের মেঘালয় অঞ্চলে দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত খনিজ উত্তোলন, বন উজাড় এবং পরিবেশ ধ্বংস। সীমান্তবর্তী পাহাড়ি ছড়াগুলোর মাধ্যমে বিভিন্ন দূষক উপাদান হাওরে প্রবেশ করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত, আকস্মিক পাহাড়ি ঢল, পলিভরাট এবং আন্তঃসীমান্ত দূষণ মিলিয়ে হাওরের পরিবেশগত ভারসাম্য ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে।
এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমিগুলোর মতো টাঙ্গুয়ার হাওরেও প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত ছিল- কীভাবে জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা যায়। কিন্তু আমাদের আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে- কীভাবে আরও বেশি পর্যটক আনা যায়।
এটি নীতিগতভাবে ভুল।
কারণ কোনো জলাভূমির প্রধান পরিচয় পর্যটনকেন্দ্র নয়; তার প্রধান পরিচয় একটি জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র। জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করে, মাছের প্রজনন ব্যাহত করে, পাখির আবাস নষ্ট করে, স্থানীয় সংস্কৃতিকে বিপন্ন করে এবং মানুষের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে যে পর্যটন পরিচালিত হয়, তাকে পরিবেশবান্ধব পর্যটন বলা যায় না।
নিঝুমের মৃত্যু আমাদের সামনে সেই বাস্তবতাকেই উন্মোচন করেছে।
আজ সময় এসেছে সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়ার। টাঙ্গুয়ার হাওরে বর্তমান বাণিজ্যিক পর্যটন কার্যক্রম অবিলম্বে স্থগিত করে একটি স্বাধীন ও বৈজ্ঞানিক পরিবেশগত মূল্যায়ন পরিচালনা করা প্রয়োজন। জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। হাওরের জলজ উদ্ভিদ, দেশীয় মাছ, পাখি ও বনাঞ্চল পুনরুদ্ধারে বিশেষ পরিকল্পনা নিতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে হবে।
নিঝুম আর ফিরে আসবে না। কিন্তু তার মৃত্যু আমাদের সামনে যে প্রশ্ন রেখে গেছে, তার উত্তর দেওয়া এখন রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কারণ একটি সভ্য সমাজের সাফল্য তার পর্যটন আয় দিয়ে নয়; বরং সে কতটা সফলভাবে তার শিশুদের জীবন, তার প্রকৃতি এবং তার ভবিষ্যৎকে রক্ষা করতে পারে, তার মধ্যেই নিহিত।
বিশ্ব পরিবেশ দিবসে টাঙ্গুয়ার হাওর আমাদের যে শিক্ষা দিয়েছে, তা অত্যন্ত নির্মম- প্রকৃতিকে উপেক্ষা করে উন্নয়নের যে পথ, তার শেষ প্রান্তে থাকে ধ্বংস, অনুশোচনা এবং নিঝুমের মতো আরও অনেক অসময়ে ঝরে যাওয়া জীবন।
[সিলেট ভয়েস-এ প্রকাশিত অভিমত, মতামত, কলাম ও চিঠিপত্র একান্তই লেখকের নিজস্ব