প্রকৃতি কখনো প্রতিশোধ নেয় না, বরং তার ভারসাম্য নষ্ট হলে তার প্রতিক্রিয়াই ফিরে আসে মানুষের জীবনে। বাংলাদেশের হাওরাঞ্চল এই সত্যের এক জীবন্ত উদাহরণ। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ জলাভূমি একদিকে যেমন মানুষের জীবন-জীবিকার অবলম্বন, অন্যদিকে তেমনি অসংখ্য মাছ, পাখি, উদ্ভিদ ও জলজ প্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল। আর এই হাওরভূমির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশব্যবস্থাগুলোর একটি টাঙ্গুয়ার হাওর। সুনামগঞ্জের তাহিরপুর ও মধ্যনগর উপজেলায় বিস্তৃত টাঙ্গুয়ার হাওর বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি। এর অনন্য জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশগত গুরুত্ব বিবেচনায় ২০০০ সালে এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রামসার সাইটের মর্যাদা লাভ করে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত, প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘনঘটা এবং মানুষের ক্রমবর্ধমান চাপের কারণে এই অনন্য প্রতিবেশব্যবস্থা এখন নানা সংকটের মুখোমুখি।

প্রশ্ন হলো প্রাকৃতিক দুর্যোগ কি একাই টাঙ্গুয়ার হাওরের জীববৈচিত্র্যকে বিপন্ন করছে? উত্তর হলো, না। বরং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দুর্যোগের ধরন ও তীব্রতার পরিবর্তনের সঙ্গে মানবসৃষ্ট চাপ যুক্ত হয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

দুর্যোগের ধরন বদলাচ্ছে

হাওরাঞ্চলের মানুষের কাছে বন্যা কোনো নতুন বিষয় নয়। বর্ষা আসবে, হাওর পানিতে ভরে উঠবে এটাই স্বাভাবিক। বরং এই পানিই টাঙ্গুয়ার হাওরের প্রাণ। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় যখন স্বাভাবিক পানিচক্রের পরিবর্তে অস্বাভাবিক সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত, উজানের ঢল কিংবা দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাতের ধরন ও সময়ের পরিবর্তন ঘটছে। অল্প সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের ফলে পাহাড়ি ঢল দ্রুত নেমে আসে। পানির উচ্চতা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে হাওরের বিভিন্ন বিল, খাল ও জলাশয়ের স্বাভাবিক পরিবেশে পরিবর্তন ঘটে। এতে মাছের প্রজনন, জলজ উদ্ভিদের বিস্তার এবং বিভিন্ন জলজ প্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।প্রকৃতির স্বাভাবিক ছন্দে পানি যেমন জীবন সৃষ্টি করে, অস্বাভাবিক পানির প্রবাহ তেমনি কখনো কখনো সেই জীবনব্যবস্থার ওপর আঘাত হানে।



মাছের প্রজননে সংকট

টাঙ্গুয়ার হাওরের সবচেয়ে বড় সম্পদগুলোর একটি হলো এর মৎস্যসম্পদ। বহু প্রজাতির দেশীয় মাছের প্রজনন ও বেড়ে ওঠার জন্য হাওরের বিল ও জলাশয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে পানির গভীরতা, স্রোত ও তাপমাত্রায় আকস্মিক পরিবর্তন ঘটলে মাছের প্রজনন প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে। অতিরিক্ত পানির স্রোতে মাছের ডিম ও পোনা ভেসে যেতে পারে কিংবা উপযুক্ত প্রজননক্ষেত্র নষ্ট হতে পারে। আবার শুষ্ক মৌসুমে পানির পরিমাণ দ্রুত কমে গেলে মাছের বিচরণক্ষেত্র সংকুচিত হয়। এর সঙ্গে যদি অবৈধ ও অতিরিক্ত মাছ আহরণ, নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার এবং প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা যুক্ত হয়, তাহলে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যসম্পদের পুনরুদ্ধার আরও কঠিন হয়ে পড়ে। অর্থাৎ দুর্যোগের আঘাত যতটা ক্ষতি করে, দুর্যোগের পর মানুষের অনিয়ন্ত্রিত কর্মকাণ্ড অনেক সময় সেই ক্ষতিকে দীর্ঘস্থায়ী করে।



পাখিদের জন্য বদলে যাচ্ছে আবাসস্থল

শীত মৌসুমে টাঙ্গুয়ার হাওর পরিযায়ী পাখিদের কলকাকলিতে মুখর হয়ে ওঠে। দূরদেশ থেকে আসা এসব পাখির জন্য হাওরের জলাভূমি খাদ্য, আশ্রয় ও বিশ্রামের গুরুত্বপূর্ণ স্থান। কিন্তু হাওরের পানি ও জলজ উদ্ভিদের স্বাভাবিক ভারসাম্যে পরিবর্তন হলে পাখিদের খাদ্যের উৎসেও পরিবর্তন আসে। অতিরিক্ত পানি, অস্বাভাবিক জলাবদ্ধতা কিংবা শুষ্ক মৌসুমে দ্রুত পানি কমে যাওয়ার ফলে কোনো কোনো এলাকায় পাখির উপযোগী খাদ্য ও আবাসস্থল কমে যেতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মানুষের অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন। উচ্চ শব্দ, ইঞ্জিনচালিত নৌযানের চলাচল এবং পাখির বিচরণক্ষেত্রে মানুষের অনুপ্রবেশ পরিযায়ী পাখিদের স্বাভাবিক আচরণে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। প্রকৃতির কাছে যে পাখি হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে আসে, তার কাছে নিরাপদ ও নিরিবিলি আবাসস্থলই সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে শুধু আইন করে পাখি সংরক্ষণ সম্ভব নয়।



বজ্রপাত: হাওরের আরেক আতঙ্ক

হাওরাঞ্চলে বজ্রপাত একটি নিয়মিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ। বিস্তীর্ণ জলরাশির কারণে এখানে বজ্রপাতের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি অনুভূত হয়। মাছ ধরতে যাওয়া জেলে, কৃষক ও নৌযাত্রীরা যেমন ঝুঁকিতে থাকেন, তেমনি বজ্রপাতের সরাসরি প্রভাব জলজ প্রাণীর ওপরও পড়তে পারে।

তবে বজ্রপাতের কারণে হাওরের জীববৈচিত্র্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি কী ধরনের প্রভাব পড়ছে, সে বিষয়ে পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক গবেষণা নেই। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে বজ্রপাতের প্রবণতা এবং এর পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে গবেষণা এখন সময়ের দাবি।



অতিবৃষ্টি যেমন সমস্যা, খরাও তেমনি

টাঙ্গুয়ার হাওরের জীববৈচিত্র্যের জন্য শুধু অতিরিক্ত পানিই হুমকি নয়। শুষ্ক মৌসুমে পানির ঘাটতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। হাওরের কোনো কোনো জলাশয়ে পানি দ্রুত কমে গেলে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর আবাসস্থল সংকুচিত হয়। ছোট জলাশয়ে পানির তাপমাত্রা বাড়তে পারে, পানির গুণগত মান পরিবর্তিত হতে পারে এবং খাদ্যের সংকট তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ টাঙ্গুয়ার হাওরের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ হলো পানির স্বাভাবিকতা বজায় রাখা। পানি বেশি হলেই ভালো, কম হলেই খারাপ বিষয়টি এত সরল নয়। কখন, কতটা এবং কীভাবে পানি আসছে ও বের হচ্ছে, সেটিই আসল প্রশ্ন।



প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে মানবসৃষ্ট দুর্যোগ

টাঙ্গুয়ার হাওরের সবচেয়ে বড় সংকট সম্ভবত এখানেই। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি যদি মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে বহুগুণ বেড়ে যায়, তাহলে সেটিকে আর শুধু ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ বলা যায় না।

প্লাস্টিক ও পলিথিন দূষণ, অবৈধ মাছ শিকার, নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার, জলজ উদ্ভিদ ধ্বংস, অপরিকল্পিত পর্যটন, ইঞ্জিনচালিত নৌযানের অবাধ চলাচল এবং কৃষিজমিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহারের ফলে হাওরের ওপর ক্রমাগত চাপ তৈরি হচ্ছে। একটি সুস্থ প্রতিবেশব্যবস্থা প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর নিজেকে অনেকটা পুনরুদ্ধার করতে পারে। কিন্তু যখন সেই প্রতিবেশব্যবস্থাকে প্রতিদিন মানুষের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দুর্বল করে দেওয়া হয়, তখন দুর্যোগের আঘাত আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। তাই টাঙ্গুয়ার হাওরের সংকটকে শুধু ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব’ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশদূষণ, সম্পদের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনার সম্মিলিত ফল।



রামসার স্বীকৃতি কি শুধু পরিচয়ের জন্য?

টাঙ্গুয়ার হাওর আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি। রামসার সাইটের মর্যাদা শুধু একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার দায়বদ্ধতা।

প্রশ্ন হচ্ছে এই আন্তর্জাতিক মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আমরা কি হাওরকে পরিচালনা করতে পারছি?

যদি একটি রামসার সাইটে অবাধে প্লাস্টিক বর্জ্য জমে, অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন চলে, প্রজনন মৌসুমে মাছের নির্বিচার আহরণ হয় এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর একের পর এক চাপ তৈরি হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির অর্থই বা কী?

স্বীকৃতি অর্জন গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু স্বীকৃতির মর্যাদা রক্ষা করা তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ।



কী করতে হবে

টাঙ্গুয়ার হাওর রক্ষায় এখন প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনা। শুধু কোনো একটি দপ্তরের উদ্যোগে এ কাজ সম্ভব নয়। পরিবেশ, মৎস্য, বন, পানি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় প্রশাসন এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

প্রথমত, হাওরের পানি, মাছ, পাখি ও উদ্ভিদের ওপর নিয়মিত বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ চালাতে হবে। কোন দুর্যোগে কোন প্রজাতি কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে—তার তথ্যভিত্তিক ডাটাবেজ তৈরি করা জরুরি।

দ্বিতীয়ত, হাওরের সংবেদনশীল এলাকা চিহ্নিত করে সেখানে পর্যটন ও নৌযান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। পরিবেশবান্ধব পর্যটন ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। পর্যটকদের সংখ্যা নয়, প্রকৃতির ধারণক্ষমতাকে গুরুত্ব দিতে হবে।

তৃতীয়ত, মাছের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র সংরক্ষণে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। স্থানীয় জেলেদের সম্পৃক্ত করে কমিউনিটি-ভিত্তিক মৎস্য ব্যবস্থাপনা চালু করা যেতে পারে।

চতুর্থত, প্লাস্টিক ও পলিথিনমুক্ত হাওর নিশ্চিত করতে হবে। শুধু পর্যটকদের ওপর দায় চাপালে হবে না; নৌযান মালিক, ব্যবসায়ী, স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে এর আওতায় আনতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হাওরবাসীকে সংরক্ষণ কার্যক্রমের অংশীদার করতে হবে। যে মানুষ প্রজন্মের পর প্রজন্ম হাওরের ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছে, তাকে বাদ দিয়ে হাওর রক্ষা সম্ভব নয়।



এখনই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়

প্রকৃতির পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন না করলে টাঙ্গুয়ার হাওরের ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। আজ যে মাছ আছে, আগামী প্রজন্মে তা নাও থাকতে পারে। যে পাখি প্রতিবছর এখানে আসে, আবাসস্থল হারালে সে অন্যত্র চলে যেতে পারে। যে জলজ উদ্ভিদ হাওরের পরিবেশকে ভারসাম্যপূর্ণ রাখে, তা হারিয়ে গেলে পুরো খাদ্যশৃঙ্খলেই তার প্রভাব পড়বে।

টাঙ্গুয়ার হাওরকে বাঁচানোর লড়াই তাই শুধু মাছ, পাখি কিংবা জলজ উদ্ভিদ রক্ষার লড়াই নয়। এটি একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেশব্যবস্থা, একটি জনপদ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবন-জীবিকা রক্ষার লড়াই। প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমরা বন্ধ করতে পারব না। কিন্তু দুর্যোগের ক্ষতি কমানোর সক্ষমতা তৈরি করতে পারি। জলবায়ু পরিবর্তন থামানোর ক্ষমতা এককভাবে আমাদের হাতে নেই, কিন্তু টাঙ্গুয়ার হাওরকে আরও দুর্বল করে দেওয়ার কর্মকাণ্ড বন্ধ করার ক্ষমতা আমাদের আছে। এখন প্রয়োজন সেই রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক সমন্বয় এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা। টাঙ্গুয়ার হাওরকে শুধু পর্যটনের আকর্ষণ হিসেবে নয়, একটি জীবন্ত প্রতিবেশব্যবস্থা হিসেবে দেখতে হবে। কারণ হাওর হারালে শুধু একটি জলাভূমি হারাবে না হারিয়ে যাবে আমাদের প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের একটি অমূল্য সম্পদ।



লেখক: প্রকৌশলী মো.মিজানুর রহমান
mizan.pio@gmail.com

[সিলেট ভয়েস-এ প্রকাশিত অভিমত, মতামত, কলাম ও চিঠিপত্র একান্তই লেখকের নিজস্ব।]


শেয়ার করুনঃ