খালেদ উদ-দীন
ডক্টর সফিউদ্দিন আহমদ: জ্যোতির্ময় প্রাজ্ঞজন
মোস্তফা সবুজ
প্রকাশঃ ২৬ জুন, ২০২৬ ৫:৫৩ অপরাহ্ন
‘সাবঅল্টার্ন’ শব্দটা বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের জগতে বা পাবলিক স্পেসে একেবারেই পরিচিত নয় কিন্তু পাশের দেশ ভারতে বেশ পরিচিত শব্দ। এমনকি তাদের প্রাইমারি স্কুল শেষ করা বাচ্চারা টার্মটা ভালো বুঝিয়ে বলতে পারে বলে আমার ধারণা।
গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের ‘সাবঅল্টার্নরা কি কথা বলতে পারে?’-- পশ্চিমা বুদ্ধিজীবীদের সমালোচনা করে এই লেখাটা অনেক বছর আগের লেখা, তখন ইন্টারনেটের যুগই ছিলনা বললে চলে।
কিন্তু এখন সাবঅল্টার্নরা কথা বলতে পারে এবং তাদের কথা সবাই পড়ে বা শোনে। সবাই না শুনলেও দেশের জনসংখ্যার অনেক বড় একটা অংশ তাদের কথা শোনে, পুলিশ তাদের কথা শোনে, অনেক সময় সরকার বা রাষ্ট্র তাদের কথা শোনে।
ফেসবুকের মাধ্যমে অনেক সাবঅল্টার্ন-আর্ট এখন মানুষের কাছে প্রিয়। সেটা অন্যায়ের বিরুদ্ধে একটা গালিও হতে পারে, আবার একজন প্রান্তিক কৃষকের একটা আন-এডিটেড ভিডিও হতে পারে। অনেক ভক্ত, অনুসারী তৈরী হয় এখানে। যেসব গ্রামের প্রয়াত বাউল শিল্পীদের কেউ চিনতো না বা জানতো না তাদের অনেকে এখন বিখ্যাত কেবল ফেসবুকের মাধ্যমে।
এর বাইরে এখন জেলখানা থেকেও ফেসবুকে কাউকে কাউকে লিখতে দেখা গেছে, পতিতালয় থেকেও নিয়মিত ভিডিও শেয়ার করতে দেখা যায়, কিংবা যেখানে সাধারণ মানুষের যাতায়াত নেই, সেই সুন্দরবন থেকেও জেলেরা ফেসবুকে লেখেন, ভিডিও শেয়ার করেন, কন্টেট তৈরী করে ছেড়ে দেন সেটা আমরা দেখি বা শুনি। এতে করে এই প্রান্তিক মানুষগুলোর বক্তব্য আমাদের শোনার সুযোগ হয়।
স্পিভাকের যে আপত্তি ছিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিকাশ ঘটার পরে সেই আপত্তি আর ততটুকু আছে কি? এখন প্রান্তের মানুষ তার নিজের মতো করে, নিজের চিন্তা দিয়ে তার ফেসবুকে কথা বলে, খুব সাধারণ একজন ভিক্ষুক যার একটা স্মার্টফোন আছে এবং ফেসবুক আছে সে তার নিজের মত করে ফেসবুকে কথা বলে, তার চিন্তা-চেতনা শেয়ার করে, কিংবা সরকার বা রাষ্ট্রকে গালি দেয়। এক্ষেত্রে কারো নিয়ন্ত্রণ নেই, কেউ সেই কথা সম্পাদনা বা এডিট করে দেয় না। আর এটাই হলো -সাবঅল্টার্নরা এখন কথা বলতে পারে। কথা বলছে। তবে তাত্ত্বিকমতে এরাও আসল সাবঅল্টার্ন নয়।
কিন্তু এ কথা ১০০ শতাংশ মিথ্যা যে নাবিলা ইদ্রিস, হাসনাত আব্দুল্লাহ কিংবা সাদিক কায়েমরা সাবঅল্টার্ন। এরা বর্তমানে সমাজের এলিট। এরা অনেক বছর আগেই সমাজের প্রিভিলেজ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। বরঞ্চ ছাত্র অবস্থায় আমরা তাদের সাবঅল্টার্নদের প্রতিনিধি বলতে পারি।
আর অক্সফোর্ড ইউনিয়িননে গিয়ে কথা বলে এরা সাবঅল্টার্ন হয়ে যায় না। বরং সেখানে যারা কথা বলে সবাই সমাজে কোনো না কোনো প্রিভিলেজ পেলেই না সেখানে পৌঁছাতে পারে, কথা বলতে পারে। মানে, সেখানে (অক্সফোর্ড ইউনিয়নে) সত্যিকারের কোনো সাবঅল্টার্ন-এর কথা বলার কোনো সুযোগই নেই। এত বড় বিখ্যাত প্লাটফর্মে, এত আয়োজন করে সাবঅল্টার্নদের কথা কেউ শোনে না।
বরঞ্চ আমি বলবো নাবিলা এবং শফিক ভাইয়ের পত্রিকার বুদ্ধিজীবীরা অযথা একটা কুতর্ক শুরু করেছেন এগুলো দিয়ে। তারা জাতিকে যে বোকা বানানোর চেষ্টা করেছেন সেটা শুরুতেই ব্যর্থ হয়েছে। কারণ ডানপন্থী বুদ্ধিজীবীরা সাবঅল্টার্ন শব্দটা যতটুকু বোঝেন বামপন্থী শিক্ষানবিশ একজন ছাত্র তার থেকে শব্দটি আরো বেশি বোঝেন।
তার চেয়ে নাবিলারা যদি এটা বলতেন যে সাবঅল্টার্নরা কথা বলার কারণে তাঁদের অংশগ্রহণে একটা বিপ্লব হয়েছে। হাসনাত আব্দুল্লাহ সংসদে কিংবা সাদিক কায়েমরা অক্সফোর্ডে গিয়ে সেই বিপ্লব বা গণঅভ্যুত্থানের প্রতিনিধিত্ব করছে। তাহলেও জাতি কিছু একটা ধরে নেয়ার মত করে বুঝতো।
খুব অদ্ভুত ব্যাপার হলো ডানপন্থীরাও পশ্চিমের এত ফেটিশ, সেটা নাবিলা এই কথা না বললে এই দেশে এত স্পট করে বোঝা মুশকিল ছিল। না হলে হাসনাত আব্দুল্লাহ আর সাদিক কায়েম যেই অক্সফোর্ড- এর শিক্ষার্থীদের সাধারণ কথা বলার একটা জায়গায় গিয়ে কথা বললো আর সাথে সাথে সেটাকে তারা গ্লোরিফাই করলো -সাবঅল্টার্নরা কথা বলছে বলে। অথচ হাসনাত আব্দুল্লাহ নিয়মিত একটা দেশের জাতীয় সংসদে কথা বলেন আর সাদিক কায়েম তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের একজন সুপ্রিম নেতা।
সত্যিকার সাবঅল্টার্ন আমরা তাদেরই কৌতুক করে বলতে পারি, এখন যাদের কাছে একটা স্মার্টফোন নাই। যাদের ফোন নাই তারা সত্যিই কথা বলতে পারেন না। অবশ্য ফোন থাকলেই যে সবাই কথা বলেন তাও না। আর একটা বড় অংশ আছে প্রান্তিকে যাদেরকে আমরা সাবঅল্টার্ন ধরলে তারা এখন অন্তত ফেসবুকে কথা বলতে পারেন। আর সেটাকেও আমি এখানে একেবারেই কাঁচা বা র’ কিংবা আনএডিটেড ভার্সন বলতে চাইছি।
যাক সে কথা। এখন আসি আসল আলোচনায়। এই আন-এডিটেড ভার্সনের কথা আমি বলতে চাইছি তার শক্তি বা পাওয়ার আসলে কতটুকু? আসুন সেটা বোঝার চেষ্টা করি একটু।
ফেসবুকেই যেই ঘটনায় ভাইরাল হয় বা করা হয়, সেটা খুব সাধারণ থেকে অসাধারণরা মানুষরাই করে থাকেন। সবাই পক্ষে-বিপক্ষে লেখে বা মতামত দেন। তিনি লিখতে পারেন না তিনিও অন্যদের মত -যেটা নিজের সাথে মিলে যায় সেটা তার ওয়ালে বা পেইজে শেয়ার করে থাকেন। তবে এখানে সামাজিক যোগাযোগ ব্যববহারকারীরা যাই লিখেন না কেন সেটাই মূলত-আন এডিটেড ভার্সন। ব্যক্তির একক কর্ম।
এখন এটার পাওয়ার হলো কোনো কিছু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলেই সেটা নিয়ে হুমড়ি খেয়ে পরে দেশের সব-স্ট্যান্ডার্ড গণমাধ্যম। কোন ঘটনা কতটুকু ভাইরাল সেই অনুযায়ী খবরে গুরুত্ব পায়। বেশি ভাইরাল হলে পত্রিকার ফ্রন্ট পেজে লিড নিউজ হয়। একেবারে কম হলে ব্যাক পেজের লিড নিউজ। আর টেলিভিশন গুলো তো ঘন্টায় ঘন্টায় নিউজ, লাইভ, টকশো এগুলো করে থাকে।
এখন যে জিনিসটা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আন-এডিটেড ভার্সন হয়ে আসলো, শেয়ার হল, মিলিয়ন মিলিয়ন ভিউ হলো, সেটা নিয়ন্ত্রণ করে মূল ধারার গণমাধ্যমকে। এখানে শক্তিটা বোঝার চেষ্টা করুন একবার। এরপর সরকার বা রাষ্ট্র সেটা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। এমপি-মন্ত্রীরা কথা বলা শুরু করলেন। এমন কি সংসদ অধিবেশনে বিতর্ক হলো। কোনো গুরুতর অপরাধ হলে বা অনেক সময় কম গুরুতর হলেও এক দিন বা ২৪ ঘন্টার মধ্যে আসামি ধরা পড়লো। মাত্র ১৭-২০ দিনের মধ্যে বিচার হয়েও গেলো। এটাই বর্তমানে অসম্পাদীয় ভার্সনের পাওয়ার।
তবে সব ক্ষেত্রে যে সেটা হয় তাও না। এনেক সময় সরকার ভাইরাল আইটেমের সাথে খাপ খাওয়াতে পারে না। অনেক সময় রাষ্ট্র নিজেই একটা পক্ষের সাথে জড়িত থাকে। যেমন তনু হত্যার বিষয়ে রাষ্ট্র এত দিনে এসে খুব সামান্য কিছুই করতে পেরেছে। সাংবাদিক সাগর-রুনি হত্যায় সরকার এখনো কিছুই করতে পারেনি।
আমার দেখলাম খুব সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ-কথাবার্তা, মতামত, আনএডিটেড ছবি, ভিডিও ফুটেজ ২৪-সালে একটা গণঅভ্যুথান ঘটাতে সক্ষম হলো।
বর্তমানে ফেসবুকে খুব সাধারণ মানুষের একসাথে প্রতিবাদ গণমাধ্যম ও রাষ্ট্রের অনেক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছে। গণমাধ্যমের পশ্চাদ্দেশ থ্যাতলে দিচ্ছে এক একটা ভাইরাল আইটেম। যদিও গণমাধ্যমের হর্তাকর্তারা এটা নিয়ে প্রায়ই আপত্তি তোলেন।
মানব সভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ঘটনা হলো ফেসবুকে মানুষের মত প্রকাশ করার ক্ষমতা পাওয়া। এটাই এখন পর্যন্ত মানব ইতিহাসের সবচেয়ে মহত্বপূর্ণ অর্জন বলে অনেকে মনে করে থাকেন। যদিও এই আন-এডিটেড ভার্সনের কারণে অনেক গুরুতর ক্রাইম হতে পারে, ধর্মের নামে দাঙ্গা হতে পারে, পারিবারিক নিধন হচ্ছে। নারীরা সবচেয়ে বেশি ডিজিটাল সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মব হতেও দেখেছি অনেক।
কিন্তু এর সবচেয়ে পাওয়ারফুল দিকটি হলো এটা ডিক্টেটরকেও ডিকটেড করে। এটা সরকার এবং মূল ধারার গণমাধ্যমের দৈনন্দিন কার্যক্রমকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সেটা তারা পছন্দ করুক আর না করুক।
তবে গণমাধ্যম, এই সাধারণ মানুষের এসব আন-এডিটেড ভাষণকে পুঁজি করে এগিয়ে গেলেও এটাকে তারা ঘৃণা করে এবং এটাকে খারাপ বলে প্রচারণা চালায়। এমনকি মিডিয়ার নিজের অনেক বট আছে যারা সাধারণ মানুষের এই আন-এডিটেড কন্টেন্টগুলোর বিরুদ্ধে নিয়মিত লিখছে এবং এক ধরণের বিদ্বেষ তৈরির চেষ্টা করছে। তাতে অবশ্য কিছু যায় আসেনা বলেই আমার মনে হয়।
আসল কথা হলো যারা এই আন-এডিটেড ভার্সন গ্রহণ করছি, তাদেরই শিখতে হবে কোনটা গ্রহণ করা উচিত। আপাতত এছাড়া খারাপ দিক থেকে বাঁচার কোনো উপায় নেই। আইন দিয়ে এগুলো বন্ধ করা যায় না। একমাত্র সচেতনতা তৈরী ছাড়া সেটা সম্ভব নয়।
[সিলেট ভয়েস-এ প্রকাশিত অভিমত, মতামত, কলাম ও চিঠিপত্র একান্তই লেখকের নিজস্ব।]