হবিগঞ্জ-মৌলভীবাজারে ১১ হাজার পরিবার পানিবন্দী, উচ্চ ঝুঁকিতে সিলেট ও সুনামগঞ্জ
প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ
প্রকাশঃ ১০ জুলাই, ২০২৬ ১০:৩৩ অপরাহ্ন
টানা বর্ষণ ও ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠেছে। হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে আকস্মিক বন্যায় অন্তত ২২টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দী হয়ে পড়েছে ১১ হাজারের বেশি পরিবার।
এদিকে নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় আগামী ২৪ ঘণ্টায় সিলেট ও সুনামগঞ্জেও বন্যার আশঙ্কা করেছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিউসি)।
শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টায় প্রকাশিত বিশেষ বার্তায় এফএফডব্লিউসি জানায়, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের খোয়াই, মনু ও কুশিয়ারা নদীর কয়েকটি পয়েন্টে পানি ইতোমধ্যে বিপদসীমা অতিক্রম করেছে। সুনামগঞ্জের মারকুলি পয়েন্টে কুশিয়ারার পানি বিপদসীমার ২২ সেন্টিমিটার এবং সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে ১৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আগামী ২৪ ঘন্টা থেকে ৭২ ঘন্টা পর্যন্ত সময়ে সুরমা, কুশিয়ারা ও মনু নদীর পানি আরও বাড়তে পারে।
পূর্বাভাসে আরও বলা হয়েছে, কুশিয়ারা ও সুরমা নদী-সংলগ্ন সিলেট ও সুনামগঞ্জের নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। পাশাপাশি সারিগোয়াইন, সোমেশ্বরী, যাদুকাটা ও ভুগাই-কংস নদীর পানিও কয়েকটি স্থানে বিপদসীমা অতিক্রম করার আশঙ্কা রয়েছে।
এফএফডব্লিউসি জানিয়েছে, উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও সংলগ্ন এলাকায় সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে গত কয়েক দিনে সিলেট বিভাগ এবং ভারতের ত্রিপুরা, আসাম, মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। আগামী ১০ থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকতে পারে। এ সময়ে সিলেট ও আশপাশের উজান এলাকায় ২০০ থেকে ২৫০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের সাতটি জেলা বন্যাকবলিত। আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে আরও আটটি জেলা বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার ইতোমধ্যে বন্যার কবলে পড়লেও সিলেট ও সুনামগঞ্জকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ জেলার তালিকায় রাখা হয়েছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান বলেন, উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও উজানের বৃষ্টিপাতের ওপর আগামী দিনের পরিস্থিতি নির্ভর করবে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে সিলেট অঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণকক্ষ ২৪ ঘণ্টা চালু রাখা হয়েছে।
এদিকে আকষ্মিক বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার। দুই জেলায় নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বসতবাড়ি, সড়ক ও ফসলি জমি তলিয়ে যাওয়ায় হাজারো মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছেন। অনেক এলাকায় দেখা দিয়েছে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও আশ্রয় সংকট।
হবিগঞ্জে খোয়াই নদীর দুটি স্থানে পানি প্রবেশ করায় সদর, বানিয়াচং ও বাহুবল উপজেলার অন্তত ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাত থেকে কালিগঞ্জ-চরহামুয়া এলাকায় বাঁধ ভেঙে এবং রাধাপুর এলাকায় নদীর পানি উপচে লোকালয়ে ঢুকতে শুরু করে। এতে নোয়াবাদ, চরহামুয়া, কালিগঞ্জ, যাদবপুর, বনগাঁওসহ বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে চলে যায়।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, তিন উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের ছয় হাজারের বেশি পরিবার পানিবন্দী হয়েছে। হবিগঞ্জ সদর উপজেলার প্রায় ৩০ হাজার মানুষ বন্যার প্রভাবে দুর্ভোগে রয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় এক হাজার মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছেন। পানি বৃদ্ধির কারণে হবিগঞ্জ-মিরপুর সড়কের বিভিন্ন অংশ তলিয়ে গিয়ে যোগাযোগও ব্যাহত হচ্ছে।
হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সায়েদুর রহমান বলেন, খোয়াই নদীর দুটি স্থান দিয়ে পানি প্রবেশ করছে। প্রবল স্রোতের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত অংশে তাৎক্ষণিকভাবে মেরামত কাজ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
হবিগঞ্জ জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার কার্যালয়ের ওয়ারল্যাস অপারেটর মো. নুর উদ্দিন বলেন, জেলার তিনটি উপজেলার ৫টি ইউনিয়ন পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে ৬ হাজারেরও বেশি পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। বন্যা আক্রান্তদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ শুরু হয়েছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন বলেন, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় পাঁচ লাখ টাকা, ১০০ টন চাল ও এক হাজার ৮২০ প্যাকেট শুকনো খাবার মজুত রয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন উপজেলায় এক হাজার ৬২০ প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
মৌলভীবাজারেও মনু ও ধলাই নদীর ভাঙনে জেলা সদর, কমলগঞ্জ, রাজনগর ও কুলাউড়া উপজেলার ১৭টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। জেলা প্রশাসনের হিসাবে প্রায় পাঁচ হাজার পরিবার পানিবন্দী রয়েছে। অনেক সড়ক ডুবে যাওয়ায় যোগাযোগে বিঘ্ন ঘটছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, মনু নদীর পানি বিপদসীমার প্রায় ৮০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ভাঙনকবলিত অংশ দিয়ে পানি প্রবেশ করে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। ইতোমধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ মেরামতের কাজ চলছে।
বন্যার এই পরিস্থিতিতে মৌলভীবাজারের রাজনগরে এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে। টেংরা ইউনিয়নের আকুয়া গ্রামের বাসিন্দা মো. আশরফ মিয়া বন্যার পানিতে আটকা পড়ে মারা যান। পরিবারের সদস্যরা নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেলেও তিনি ঘরে থেকে যান। শুক্রবার সকালে স্বজনরা তার মরদেহ উদ্ধার করেন।
মৌলভীবাজার জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকতা মোহাম্মদ ছাদু মিয়া জানান, বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। তবে এ পর্যন্ত চারটি উপজেলার ৪ হাজার ১৭৫টি পরিবার পানিবন্দী রয়েছে। পানি কমলে ক্ষয়ক্ষতির তথ্য পাওয়া যাবে।
সিলেট, সুনামগঞ্জ, বন্যা, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নদনদী