
সিলেটে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় (এইচএসসি) অংশ নেওয়ার আগেই ‘ঝরে পড়েছে’ ২২ হাজার ৯০৮ শিক্ষার্থী। এসব শিক্ষার্থী বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) শুরু হওয়া এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল।
এ বছর সিলেট শিক্ষাবোর্ডের অধীনে পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন ৭২ হাজার ৭৪৫ জন শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে ২৯ হাজার ২১৭ জন ছেলে ও ৪৩ হাজার ৫২৮জন মেয়ে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদেশমুখী প্রবণা, পড়াশোনার প্রতি অনাগ্রহ ও ছাত্রীদের ক্ষেত্রে বাল্য বিয়েসহ নানাবিধ কারণে শিক্ষার্থীরা ঝরে পড়ছে। তবে গত বছর এইচএসসি পরীক্ষার সামগ্রীক ফলাফল খারাপ হওয়ায় এ বছর অনেকে নির্বাচনী পরীক্ষায় আটকে গেছেন। যার কারণে রেজিস্ট্রেশন করেও পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পাননি তারা।
তবে, এক শিক্ষাবর্ষেই এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন থেকে ছিটকে পড়াকে সিলেট অঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের সংকট ও সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন শিক্ষা গবেষকরা।
তাদের দাবি, শুধু সামাজিক বা অর্থনৈতিক কারণই নয়, শিক্ষা ব্যবস্থার ভেতরেও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক সংকট, পাঠ্যক্রম ও প্রশ্নপদ্ধতির পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারা এবং প্রক্রিয়াগত নানা জটিলতাও শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে।
সিলেট শিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণিতে নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে ৭৫ হাজার ৪৪৮ জন শিক্ষার্থী নিবন্ধন করেছিলো। তারমধ্যে ৩১ হাজার ৭৮৮ জন ছেলে ও ৪৩ হাজার ৬৬০ জন মেয়ে।
কিন্তু ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় নিবন্ধনকৃত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫২ হাজার ৫৪০ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। হিসেবে অনুযায়ী বাকি ২২ হাজার ৯০৮ জন শিক্ষার্থী ঝড়ে পড়েছেন। তাদের মধ্যে ছেলে ১০ হাজার ৮৩৩ জন ও মেয়ে ১২ হাজার ৭৫জন। ঝরে পড়ার হারে মেয়েদের সংখ্যা বেশি।
অবশ্য, নিবন্ধনকৃত অনেক শিক্ষার্থী দ্বাদশ শ্রেণির নির্বাচনী পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ায় চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাননি।
বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, নিয়মিত ও অনিয়মিত মিলিয়ে এবার সিলেট শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন ৭২ হাজার ৭৪৫ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে ১৯ হাজার ৮৬৭ জন অনিয়মিত পরীক্ষার্থী। মোট পরীক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্র ২৯ হাজার ২১৭ জন এবং ছাত্রী ৪৩ হাজার ৫২৮ জন। বিভাগের ৩৩৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ৯৬টি কেন্দ্রে পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন।
ভর্তির পর কেন ঝরে পড়ছে শিক্ষার্থীরা
একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার পর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ঝরে পড়ার পেছনে একাধিক কারণ চিহ্নিত করছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, সিলেট অঞ্চলে বিদেশমুখী প্রবণতা সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি। এসএসসি পাসের সনদ নিয়েই অনেক শিক্ষার্থী বিদেশে চলে যাওয়ায় তারা আর উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে না।
এ ছাড়া জীবিকার তাগিদে অল্প বয়সে চাকরি বা ব্যবসায় যুক্ত হওয়া, পড়াশোনার প্রতি অনাগ্রহ, প্রথম বর্ষে অকৃতকার্য হওয়া, পারিবারিক আর্থিক সংকট, ছাত্রীদের ক্ষেত্রে বাল্যবিয়ে, প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে কলেজের দূরত্ব এবং যাতায়াতের সমস্যা-এসব কারণও শিক্ষার্থীদের মাঝপথে পড়াশোনা ছাড়তে বাধ্য করছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, শুধু সামাজিক বা অর্থনৈতিক কারণই নয়, শিক্ষা ব্যবস্থার ভেতরেও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক সংকট, পাঠ্যক্রম ও প্রশ্নপদ্ধতির পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারা এবং প্রক্রিয়াগত নানা জটিলতাও শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে।
শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য অশনিসংকেত
শিক্ষার্থীদের এভাবে পড়ালেখা থেকে দূরে সরে যাওয়াকে ‘ভয়াবহ’ ও ‘আশঙ্কাজনক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন শিক্ষাবিদরা। শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. আবুল ফতেহ ফাত্তাহ বলেন, ‘এটা খুবই আশঙ্কাজনক। অভিভাবক হিসেবে একটা স্বপ্ন নিয়ে তাদের পরীক্ষায় সেন্টআপ করাচ্ছি। কিন্তু এই বিরাজমান অবস্থায় আমাদের ছেলেমেয়ে কিংবা শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন এইভাবে থমকে দাঁড়াবে, এটা কখনোই কাম্য না।’
তিনি বলেন, এই অবস্থা সৃষ্টির পেছনে কারণগুলো গভীরে গিয়ে খতিয়ে দেখা দরকার। শিক্ষা কর্তৃপক্ষ, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও শিক্ষাবোর্ড কর্তৃপক্ষ দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে আসল কারণগুলো চিহ্নিত করতে পারেন।
‘তবে কারণ যা-ই হোক, এই ধরনের একটা মেসাকার (ভয়াবহ) ড্রপআউট কোনোক্রমেই গ্রহণযোগ্য না। এইরকম চলতে থাকলে তো আমরা আরও কিছুদিন পরে একটা মূর্খ জাতিতে রূপান্তরিত হবো’- সিলেট ভয়েসকে যোগ করেন ওই শিক্ষাবিদ।
মুরারিচাঁদ (এমসি) কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মোহাম্মদ তোফায়েল আহম্মেদ বলেন, ‘অনেক শিক্ষার্থী এসএসসি পাসের পর পড়াশোনা শেষ না করেই প্রবাসে চলে যাচ্ছে কিংবা জীবিকার তাগিদে অল্প বয়সেই চাকরি বা ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছে। আবার ছাত্রীদের ঝরে পড়ার পেছনে কাজ করছে পড়াশোনায় পরিবারের অনাগ্রহ, পড়াশোনা চলাকালীন বাল্যবিয়ে, প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে কলেজের দূরত্ব এবং যাতায়াত ব্যবস্থার সংকট।’
সিলেট ভয়েসকে তিনি বলেন, ‘সরকারের উপবৃত্তি ও শিক্ষাবান্ধব কর্মসূচির পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং পারিবারিক মানসিকতার পরিবর্তন সবচেয়ে জরুরি। পরিবার ও সমাজ যদি সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসে এবং মেয়েদের শিক্ষার অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করে, তবেই এই ঝরে পড়ার হার শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব।’
যা বলছে সিলেট শিক্ষাবোর্ড
এ বিষয়ে সিলেট শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক বিলকিস ইয়াছমীন বলেন, ‘সিলেট অঞ্চলে অনেক শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিক শেষ করার আগেই কর্মসংস্থান বা উন্নত জীবনের আশায় বিদেশে চলে যায়। বিদেশে যাওয়ার জন্য অনেক ক্ষেত্রে এসএসসি বা সমমানের সনদই যথেষ্ট হওয়ায় তারা আর এইচএসসি পর্যন্ত পড়ালেখা চালিয়ে যায় না।’
তিনি আরও জানান, ‘নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে কেউ দেশের বাইরে চলে যায়, কেউ ঝরে পড়ে, আবার কেউ প্রথম বর্ষের পরীক্ষাই দিতে পারে না। অনেকেই শুধু এসএসসির সার্টিফিকেট নিয়ে বিদেশে চলে যায়, কারণ সেখানে ইন্টারভিউ বা চাকরির জন্য এইচএসসি পাসের প্রয়োজন হয় না।’
মেয়ে শিক্ষার্থীদের বিষয়ে অধ্যাপক বিলকিস ইয়াছমীন বলেন, ‘গ্রাম বা প্রত্যন্ত অঞ্চলে ১৮ বছরের আগেই অনেক মেয়ের বিয়ে হয়ে যায়। শ্বশুরবাড়িতে চলে যাওয়ার পর তারা আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে না।’
তাছাড়া পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি না থাকলে অর্থনৈতিক সংকট ও পারিবারিক কারণেও মেয়েদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায় বলে মনে করেন তিনি।
শেয়ার করুনঃ
তথ্যপ্রযুক্তি-শিক্ষা থেকে আরো পড়ুন
শিক্ষার্থী ঝরে পড়া, এইচএসসি পরীক্ষা, সিলেট শিক্ষা বোর্ড, বাল্যবিবাহ, শিক্ষক সংকট, শিক্ষা ব্যবস্থা


