১২ জুন ২০২৬

দৈনন্দিন / গ্রামবাংলা

বিশ্বনাথে সংকটে মুচি সম্প্রদায়

জুতা সেলাই করেই পার হচ্ছে জীবন, সংসার চলে কষ্টে

বদরুল ইসলাম মহসিন, বিশ্বনাথ, সিলেট

প্রকাশঃ ১২ জুন, ২০২৬ ২:৩৬ অপরাহ্ন


বাসিয়া ব্রিজের চার রাস্তার মুখ, গাড়ীর শব্দদূষন আর রাস্তায় মানুষের ভিড়, হেটে যাওয়া মানুষের হইচই। রোদ বৃষ্টি আর ধুলোবালি’র মাঝেও সুই আর সুতা নিয়ে কাজ করা কিছু মানুষকে জুতার কাজ করতে দেখা যায়। যাদেরকে ডাকা হয় মুচি। কথা কম বলা এসব মুচিদের রাগ নেই বরং সবসময় হাসিখুশি থেকে জুতায় পলিশ আর মালিশর কাজ করে যাচ্ছে সারাদিন। তারা সবসময় হাসিখুশি থেকেও ছেড়া ও নষ্ট জুতা রঙিন করেই যেন প্রতিদিনের অন্নের যোগান দেন । 

প্রবাসী অধ্যুষিত সিলেটের বিশ্বনাথে হাতে গোনা কয়েকজন তাদের পৈতিক পেশাকে নিয়ম করেই কাজ করছেন। তাদের দোকানে নেই কোন ব্যানার বা বিজ্ঞাপন। খোলা আকাশের নিছেই তাদের এ ব্যবসা। তারপরও তারা দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষের মতই জুতার উপর নির্ভশীল। তারা আছে বলেই মানুষেরা নিশ্চিন্তে জুতা পায়ে বের হন বাসা থেকে। 

সদর বিশ্বনাথ ইউনিয়নের রাজনগর এলাকার রাজু রবি দাশ নামের ১৭ বছরের এক কিশোরকে এ কাজে লজ্জা পাও কিনা বা লেখাপড়া কেন করছো না জানতে চাইলে সে জানায়, বাবা মারা গেছেন অনেক আগে। সংসার চালানোর জন্য লেখাপড়া হচ্ছে না। বাবার পেশাকে ধরে রেখে সংসার চালাচ্ছি এতে লজ্জা কেন পাবো। চুরিতো করছি না। 

সংসারে দায়িত্ব নিয়ে বাবার পেশাকেই ধরে রেখেছে কিশোর রবি দাশ
সে আরও বলে, আমি সৎ পথে উপার্জন করছি। এতে আমার পরিবার চলে এটাই আমার শক্তি। 

রাস্তার পাশে জুতার কারিগর বা মুচি আমাদের দৈনন্দিক জীবনের খুব পরিচিত ও অপরিহার্য। তারা সাধারণত ফুটপাত বা রাস্তার মুড়ে বা বাজারের প্রবেশ মুখে ছোট একটা বক্স বা ছাতার নিচে বসে কাজ করে থাকেন। আধুনিক চায়না জুতা বাজারে আসার প্রভাবে বিশ্বনাথে মুচি সম্প্রদায়ের লোকজনের দিনাতিপাত হচ্ছে। অভাব-অনটনের মধ্যে সংসার চালানো অনেক কষ্ট তাদের।

বিশ্বনাথ উপজেলা সদরের বাসিয়া ব্রিজের নতুনবাজার মুখে প্রায় ৪০ বছর আগে খোলা জায়গায় বসে জুতা সেলাই আর পলিশের কাজ করতেন সদরের বাসিন্দা মন্তু রবি দাশ। তিনি মারা যাওয়ায় তার ভাই ও ছেলে প্রায় বেশ কয়েক বছর ধরে এ কাজ করে যাচ্ছেন। পাশাপাশি বিশ্বনাথ পুরানবাজারস্থ বাস এষ্টেন্ডে দক্ষিণ সুরমা উপজেলার এবদালপুর গ্রামের বাসিন্দা মিন্টুর রবি দাশ (৪৫) প্রায় ২৫ থেকে ২৬ বছর ধরে বিশ্বনাথে জুতার কাজ করছেন। তার পাশে লালাবাজার এলাকার বুদুল রবি দাশও (৫০) প্রায় ২০ বছর ধরে এ এলাকায় কাজ করছেন। তারা জানান আমাদের এ পেশায় আগের মত আর কাজ নেই, শীতকালে কিছুটা কাজ হলেও এখন আমরা খুবই অসহায়। 


মিন্টুর রবি দাশ বলেন, সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সারাদিন কাজ করলে ২৫০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা হয়। শীতকালে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা রোজগার করা যায়। এ টাকা দিয়ে সংসার চালানো খুই কষ্ট। 

তিনি বলেন, সারাদিন বসে থাকায় শরীরে নানান রোগে বাসা বেঁধেছে। প্রায় ২ যুগ আগেও পুরাতন জুতা মেরামত অনেক বেশি ছিল। সেলাই আর পলিশ করার কাজ অনেক পাওয়া যেত কিন্তু এখন আগের মত কাজকাম নাই। বর্তমানে মানুষ জুতা ছেঁড়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে না। সামান্য পুরোনো বা একটু নষ্ট হলেই তা ফেলে দিয়ে নতুন জুতা কিনে নেয়। ফলে মুচিদের সেলাই বা পিন মারার কাজ কমে গেছে। বা

বাসিয়া পুলেরমুখে থাকা টেংরা গ্রামের পংখি রবি দাশ বলেন, এ কাজে জীবনটা শেষ করে দিসি। সরকারিভাবে আমরা কিছুই পাই না। আমরা মাত্র কয়েকটি পরিবার এ পেশায় কাজ করে সমাজের মানুষদের সহযোগিতা করছি। আমাদের বিশ্বনাথ উপজেলায় মুচি সম্প্রদায়ের পরিবারের এই করুণ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করছি।

এ ব্যাপারে ইউরো বাংলা পত্রিকার সিনিয়র সাংবাদিক ও বিশ্বনাথ প্রেসক্লাব’ (বর্তমান মডেল প্রেসক্লাবের) সাবেক সভাপতি আব্দুল আহাদ বলেন, উনারা আছে বলেই আমরা জুতা পড়ছি। তাদেরকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারিভাবে আরো দক্ষতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। তাদেরকে সহজ শর্তে ঋণ প্রদান করে এবং এলাকায় নতুন জুতার কারকানা তৈরির মাধ্যমে এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান উন্নত করা সম্ভব। তিনি এজন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের প্রতি এমটা আশা প্রকাশ করেন।


শেয়ার করুনঃ

দৈনন্দিন থেকে আরো পড়ুন

সিলেট, বিশ্বনাথ, মুচি সম্প্রদায়, সংকট, জীবনযাপন

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ