১১ জুন ২০২৬

দৈনন্দিন / গ্রামবাংলা

ফসলহানির পর মাছই ছিল ভরসা, এবার তাতেও নিষেধাজ্ঞা

জীবিকার তাগিদে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করছেন অনেকে

নিজস্ব প্রতিবেদক, সুনামগঞ্জ

প্রকাশঃ ১১ জুন, ২০২৬ ২:০২ অপরাহ্ন


বোরো মৌসুমে অতিবৃষ্টি ও আগাম বন্যায় ফসলহানির ধাক্কা সামলাতে না সামলাতেই নতুন সংকটে পড়েছেন সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের মানুষ। জীবিকার শেষ ভরসা হয়ে ওঠা মাছ আহরণেও এবার নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে মৎস্য বিভাগ। ফলে কৃষক, জেলে ও নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা।

মাছের প্রজনন মৌসুম বিবেচনায় গত ২৮ মে থেকে আগামী ২৬ জুন পর্যন্ত জেলার হাওর, নদ-নদী ও প্রাকৃতিক জলাশয়ে সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ করেছে মৎস্য অধিদপ্তর। দেশীয় মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি ও প্রজনন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নেওয়া এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও কোনো ধরনের প্রণোদনা বা বিকল্প সহায়তা না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জেলেরা।

‘মাছ আর ধান, হাওরাঞ্চলের প্রাণ’ এ প্রবাদে পরিচিত সুনামগঞ্জে কৃষির পাশাপাশি মাছ ধরা মানুষের জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নিবন্ধিত জেলেদের পাশাপাশি বর্ষা মৌসুমে কৃষক, দিনমজুর ও বিভিন্ন পেশার মানুষও মাছ ধরে পরিবারের চাহিদা মেটান। কিন্তু চলতি বছর বোরো মৌসুমে ফসলহানির কারণে অনেকের জন্য মাছ আহরণই ছিল একমাত্র আয়ের উৎস।

সদর উপজেলার লক্ষণশ্রী ইউনিয়নের ইসলামপুর গ্রামের কাওসার আলম ভূইয়া বলেন, বোরো মৌসুমে আমরা ধান হারাইছি। এখন জাল বাইয়া বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে সংসার চালাইতাম। মাছ না ধরলে চলমু কীভাবে? সরকার যদি সাহায্য করত, তাহলে মাছ ধরা থেকে বিরত থাকতে পারতাম। কোনো উপায় নাই, মাছ ধরতেই হইব।

একই ধরনের কথা বলেন স্থানীয় জেলে আবুল কালাম। তিনি বলেন, ইলিশ ধরা বন্ধ করলে সরকার চাল-ডাল দেয়। কিন্তু হাওরে মাছ ধরা বন্ধ করা হইছে, অথচ কোনো সহায়তা নাই। মাছ ধরা বন্ধ রাখলে আমরা বাঁচমু কীভাবে? পেটের দায়ে হাওরে যাইতেই হইব।

স্থানীয়দের মতে, মাছের প্রজনন ও দেশীয় প্রজাতি সংরক্ষণের জন্য নিষেধাজ্ঞা প্রয়োজন। তবে এ সময় জেলেদের জন্য খাদ্য সহায়তা বা আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থা না থাকলে অনেকেই জীবিকার তাগিদে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করতে বাধ্য হবেন। এতে একদিকে যেমন আইন প্রয়োগ কঠিন হবে, অন্যদিকে সংরক্ষণ কার্যক্রমের উদ্দেশ্যও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা বলেন, হাওরে এক মাস মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আমরা এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই। কিন্তু এই এক মাস জেলেরা খাবে কী? উপকূলীয় অঞ্চলের মতো হাওরের জেলেদেরও আর্থিক সহায়তা দেওয়া উচিত।

জেলা মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জে প্রায় ৯০ হাজার নিবন্ধিত জেলেসহ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার মানুষ মাছ আহরণের সঙ্গে জড়িত। এ ছাড়া বর্ষা মৌসুমে কৃষিসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ মাছ ধরে থাকেন।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. আল মিনান নূর বলেন, হাওরে শুধু জেলেরা নয়, বিভিন্ন পেশার মানুষ মাছ ধরেন। দেশীয় মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি ও প্রজনন নিশ্চিত করতে আমরা প্রচারণা চালাচ্ছি এবং নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। তবে প্রণোদনা না থাকায় নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে। নিবন্ধিত জেলেদের জন্য সরকারি সহায়তার বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। তবে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।

এদিকে হাওরাঞ্চলের মানুষের দাবি, মাছের প্রজনন রক্ষার উদ্যোগের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত জেলে ও কৃষক পরিবারের জন্য জরুরি খাদ্য সহায়তা ও প্রণোদনা নিশ্চিত করা হোক। তা না হলে ফসলহানির পর জীবিকার শেষ অবলম্বন হারিয়ে আরও গভীর সংকটে পড়বেন হাজারো মানুষ।


শেয়ার করুনঃ

দৈনন্দিন থেকে আরো পড়ুন

সুনামগঞ্জ, হাওর, মাছ, প্রশাসন, জেলে, নিষেধাজ্ঞা

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ