যখন শিশুর কান্নাও হয়ে ওঠে যুদ্ধের অস্ত্র, দক্ষিণ লেবাননে উদ্বেগ
বিশ্বজুড়ে
দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি ড্রোনের বিরুদ্ধে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের অভিযোগ
প্রকাশঃ ১০ জুন, ২০২৬ ১:১৫ অপরাহ্ন
রাত গভীর। চারপাশে নিস্তব্ধতা। হঠাৎ ভেসে আসে এক শিশুর আতঙ্কিত চিৎকার ‘বাঁচাও, বাঁচাও’। এমন শব্দ শুনলে যে কারও স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হবে বাইরে বের হয়ে দেখা, কোথাও কোনো শিশু বিপদে পড়েছে কি না। কিন্তু দক্ষিণ লেবাননের অনেক বাসিন্দার জন্য এখন এই আর্তনাদও সন্দেহের বিষয়। কারণ, তাঁদের দাবি, শব্দটি কোনো বিপদগ্রস্ত শিশুর নয়; আকাশে ভাসমান ইসরায়েলি ড্রোন থেকে সম্প্রচার করা রেকর্ড করা আওয়াজ।
দক্ষিণ লেবাননের হাব্বুশ গ্রামের প্যারামেডিক হাশেম বলেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এ ধরনের ঘটনা প্রায় নিয়মিত হয়ে উঠেছে। কখনো শিশুর কান্না, কখনো নারীর সাহায্যের আকুতি, কখনো অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন, আবার কখনো ধর্মীয় তিলাওয়াত বিভিন্ন ধরনের শব্দ সম্প্রচার করছে ইসরায়েলি কোয়াডকপ্টার ড্রোন।
মিডল ইস্ট আইকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘গতকালও গভীর রাতে শিশুদের চিৎকার শুনেছিলাম। প্রথমে মনে হয়েছিল সত্যিই কোনো শিশু বিপদে পড়েছে। পরে বুঝতে পারি, ওই সময়ে গ্রামে কোনো শিশুর থাকার কথা নয়। তখন ধারণা করি, শব্দটি ড্রোন থেকেই আসছে।’
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এটি কেবল ভয় দেখানোর কৌশল নয়; বরং মানুষকে ঘর থেকে বাইরে বের করে আনারও একটি উপায়। কৌতূহল, আতঙ্ক কিংবা সাহায্যের মানবিক প্রবৃত্তিকে কাজে লাগিয়ে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
হাশেমের ভাষায়, ‘আপনি যখন রাতের নীরবতায় এমন আর্তনাদ শুনবেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই বাইরে যেতে চাইবেন। কিন্তু এখন আমরা জানি, অনেক ক্ষেত্রেই এটি একটি ফাঁদ হতে পারে।’
এ ধরনের কৌশল নতুন নয়। গাজায় যুদ্ধ চলাকালে মানবাধিকার সংগঠন, সাংবাদিক ও স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেছিলেন, ইসরায়েলি বাহিনী লাউডস্পিকারসংবলিত ড্রোন ব্যবহার করে শিশুদের কান্না, নারীদের চিৎকার এবং সাহায্যের আবেদন সম্প্রচার করেছে।
গাজার বাসিন্দাদের মতে, এসব শব্দ শুনে অনেক মানুষ ধারণা করতেন যে আশপাশে কেউ বিপদে আছে। পরে তাঁরা দেখতে পেতেন, শব্দের উৎস আসলে আকাশে চক্কর দেওয়া ছোট ড্রোন।
সেই অভিজ্ঞতার সঙ্গে দক্ষিণ লেবাননের বর্তমান পরিস্থিতির মিল খুঁজে পাচ্ছেন স্থানীয়রা। তাঁদের মতে, যুদ্ধের চরিত্র বদলেছে, কিন্তু মানুষের মনোজগৎকে লক্ষ্যবস্তু বানানোর কৌশল একই রয়ে গেছে।
দক্ষিণাঞ্চলীয় হুলা শহরের বাসিন্দা তারেক মাজআনি মনে করেন, ড্রোন এখন শুধু নজরদারির যন্ত্র নয় এটি মনস্তাত্ত্বিক চাপ প্রয়োগেরও একটি মাধ্যম।
তিনি জানান, ২০২৫ সালের অক্টোবরে কয়েকটি গ্রামের ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া ড্রোন তাঁর নাম উল্লেখ করে বাসিন্দাদের তাঁকে বর্জনের আহ্বান জানিয়েছিল। ওই বার্তায় তাঁকে হিজবুল্লাহর সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে অভিযোগ করা হয়।
মাজআনি বলেন, ‘আমি তখন উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলাম। আশঙ্কা করছিলাম, আমাকে কিংবা আমি যেখানে থাকি সেই জায়গাকে লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে। তাই পরিবারের সদস্যদের রেখে অন্যত্র চলে যাই।’
তাঁর মতে, এ ধরনের বার্তার উদ্দেশ্য শুধু একজন ব্যক্তিকে ভয় দেখানো নয়; বরং পুরো সমাজের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করা। বিশেষ করে যারা বাস্তুচ্যুত মানুষের প্রত্যাবর্তন, পুনর্গঠন কিংবা যুদ্ধোত্তর পুনর্বাসনের দাবি তুলছেন, তাঁদের জন্য এটি এক ধরনের সতর্কবার্তা।
যুদ্ধক্ষেত্রে শব্দকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার নতুন ধারণা নয়। তবে আধুনিক প্রযুক্তির কারণে এর প্রভাব আরও জটিল হয়ে উঠেছে। যখন মানুষ বুঝতে পারে না কোনো আর্তনাদ বাস্তব নাকি কৃত্রিম, তখন সমাজে পারস্পরিক আস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে।
দক্ষিণ লেবাননের বাসিন্দারা বলছেন, এখন তাঁরা এক অদ্ভুত দ্বিধার মধ্যে বসবাস করছেন। কোনো সাহায্যের আহ্বানে সাড়া দিলে তা ফাঁদে পরিণত হতে পারে, আবার উপেক্ষা করলে সত্যিকার অর্থে বিপদে থাকা কাউকে সাহায্য না করার অপরাধবোধ তৈরি হতে পারে।
এই অনিশ্চয়তাই তাঁদের মতে সবচেয়ে বড় মানসিক চাপ।
দক্ষিণ লেবাননের ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া গ্রামগুলোতে যুদ্ধের শব্দ এখন শুধু বোমা বা গোলার বিস্ফোরণ নয়। কখনো তা ভেসে আসে একটি শিশুর কান্না হয়ে, কখনো একজন নারীর আর্তনাদ হয়ে, কখনো আবার সাহায্যের আকুতি হয়ে।
স্থানীয়দের কাছে এসব ড্রোন কেবল প্রযুক্তিগত সামরিক সরঞ্জাম নয়, বরং এমন এক উপস্থিতি, যা সব সময় আকাশে ভাসতে ভাসতে মানুষের ভয়, সন্দেহ ও অনিশ্চয়তাকে আরও গভীর করে তোলে।
ফলে দক্ষিণ লেবাননের অনেক মানুষের কাছে যুদ্ধ এখন শুধু মাটিতে নয়, মানুষের মনেও চলছে। আর সেই যুদ্ধে কখনো কখনো একটি শিশুর কান্নাও হয়ে উঠছে অস্ত্র।
আন্তর্জাতিক, মধ্যপ্রাচ্য, লেবানন, ইসরায়েল, ড্রোন