০৬ জুন ২০২৬

কৃষি / চাষাবাদ

মৌলভীবাজারের হাওরে ফসলহানির পর সহায়তার তালিকা নিয়ে ক্ষোভ কৃষকদের

প্রতিনিধি, মৌলভীবাজার

প্রকাশঃ ৬ জুন, ২০২৬ ১০:৪১ পূর্বাহ্ন


বোরো মৌসুমে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে মৌলভীবাজারের ছোট-বড় অন্তত ১৫টি হাওরের ফসল তলিয়ে গিয়ে হাজারো কৃষক চরম সংকটে পড়েছেন। বছরের একমাত্র ফসল হারিয়ে যখন তারা ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই করছেন, তখন সরকারি মানবিক সহায়তার জন্য প্রস্তুত করা ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা নিয়েও উঠেছে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ।


কৃষকদের দাবি, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত অনেকের নাম বাদ দিয়ে তালিকায় স্থান পেয়েছেন অ-কৃষক, প্রবাসী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের স্বজনরা। ফলে ফসলহানির পাশাপাশি সহায়তা বঞ্চনার আশঙ্কাও তাড়া করছে হাওরপাড়ের মানুষকে।


জেলার হাকালুকি, কাউয়াদীঘি, হাইলসহ বিভিন্ন হাওর এলাকায় ঘুরে এবং কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে আকস্মিক ঢল ও টানা বৃষ্টিতে হাজার হাজার একর বোরো ধান পানিতে তলিয়ে যায়। অনেক কৃষক ধান কাটার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, কেউবা কাটাও শুরু করেছিলেন। কিন্তু কয়েক দিনের ব্যবধানে সবকিছু ভেস্তে যায়।


যে সময় কৃষকদের ঘরে নতুন ধান ওঠার কথা ছিল, সে সময় অনেককে দেখা যাচ্ছে মানববন্ধন, প্রতিবাদ সমাবেশ কিংবা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরতে। তাদের অভিযোগ, ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরিতে মাঠপর্যায়ে সঠিক যাচাই-বাছাই করা হয়নি। ফলে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের একটি বড় অংশ এখনো সরকারি সহায়তার বাইরে রয়ে গেছে।


কমলগঞ্জ উপজেলার কেওলার হাওরের কৃষক মো. আনোয়ার খান বলেন, “এবার বোরো ধানের ফলন খুব ভালো হয়েছিল। কাটার আগেই সব ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। ঋণ করে চাষ করেছিলাম। এখন সেই ঋণ শোধ করব কীভাবে বুঝতে পারছি না। অথচ অনেক প্রকৃত কৃষকের নাম সহায়তার তালিকায় নেই।”


কুলাউড়া উপজেলার হাকালুকি হাওরের কৃষক আলী মিয়া বলেন, “বোরো ধানই আমাদের বছরের একমাত্র ভরসা। এবার কোনো ফসল ঘরে তুলতে পারিনি। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রকাশ করা হোক, যাতে সবাই দেখতে পারে কারা সহায়তা পাচ্ছে।”


রাজনগর উপজেলার কৃষক আব্দুল করিমের অভিযোগ, “আমরা মাঠে ফসল হারিয়েছি, এখন তালিকাতেও হারিয়ে যাচ্ছি। প্রকৃত কৃষকদের বাদ দিয়ে যদি তালিকা করা হয়, তাহলে আমাদের যাওয়ার জায়গা কোথায়?”


কৃষকদের অভিযোগ, ইউনিয়ন পর্যায়ে কিছু উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের মাধ্যমে তালিকা তৈরির সময় অনিয়ম হয়েছে। এতে অনেক প্রকৃত কৃষক বাদ পড়েছেন। বিশেষ করে বর্গাচাষিরা সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হয়েছেন বলে দাবি তাদের। কারণ জমির মালিক না হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে তাদের ক্ষতির বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।


কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জেলার বিভিন্ন হাওরে প্রায় ৪ হাজার ২০০ হেক্টর জমির বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ২৭ হাজার ৪৬৩ জন কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন এবং আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৮০ কোটি টাকা। সরকারের পক্ষ থেকে ১২ হাজার কৃষকের জন্য সহায়তার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে সেই সহায়তা এখনো পুরোপুরি মাঠপর্যায়ে পৌঁছেনি।


তবে কৃষক সংগঠন ও হাওর-সংশ্লিষ্ট নেতারা বলছেন, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি। তাদের দাবি, জেলার হাওরাঞ্চলে অন্তত ৫০ হাজারের বেশি কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তালিকা তৈরির আগে অনেক এলাকায় সরেজমিন যাচাই করা হয়নি। ফলে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের বড় একটি অংশ বাদ পড়েছে।


মৌলভীবাজার হাওর রক্ষা আন্দোলন সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক আসম সালেহ সোহেল বলেন, “সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন বর্গাচাষিরা। কিন্তু তালিকায় তাদের অনেকের নাম নেই। হাওরাঞ্চলের বহু কৃষক এখন পুরোপুরি নিঃস্ব। দ্রুত সঠিক জরিপ করে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।”


এ বিষয়ে মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাবেল বলেন, হাওরে ফসলহানিতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য যে সহায়তা বরাদ্দ পাওয়া গেছে, তা দ্রুত বিতরণ করা হবে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।


শেয়ার করুনঃ

কৃষি থেকে আরো পড়ুন

মৌলভীবাজার হাওর, হাওরে ফসলহানি , বোরো ধান ক্ষতি , হাকালুকি হাওর , হাইল হাওর , কাউয়াদীঘি হাওর, কৃষক সহায়তা তালিকা

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ