০২ জুন ২০২৬

দৈনন্দিন

ভিক্ষুক পুনর্বাসন প্রকল্প

সিলেটে ১০ বছরে বরাদ্দ পৌণে তিন কোটি টাকা, পুনর্বাসিত ৮৯৬

আহমেদ জামিল

প্রকাশঃ ১ জুন, ২০২৬ ৯:৪০ অপরাহ্ন

ছবিঃ নগরীর হযরত শাহজালাল রহ. মাজার প্রাঙ্গণে ভিক্ষাবৃত্তির আশায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন কয়েকজন ভিক্ষুক। ছবি: সিলেট ভয়েস

২০১০ সালে সারাদেশে ভিক্ষুকদের পুনর্বাসনে ‘ভিক্ষুক পুনর্বাসন প্রকল্প’ হাতে নিয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকার। এরপর মোটা অঙ্কের টাকা বরাদ্দ রেখে জরিপ ও পাইলটিং প্রকল্পে কেটেছে আরও ৪ বছর। পরবর্তীতে ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে স্থানীয়ভাবে শুরু হয় ভিক্ষুক পুনর্বাসনের কাজ।

গত এক দশকে সিলেটে ভিক্ষুক পুনর্বাসনে প্রায় পৌণে তিন কোটি টাকা বরাদ্দ হলেও ভিক্ষুক পুনর্বাসিত হয়েছেন মাত্র ৮৯৬ জন। সেলাই মেশিন, গবাদি পশু ও ক্ষুদ্র ব্যবসার পুজি দিয়ে তাদেরকে পুনর্বাসিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সমাজসেবা অধিদপ্তর। 

কিন্তু এতো বিপুল পরিমাণ বরাদ্দের পরও ভিক্ষুক পুনর্বাসনের হার নিয়ে প্রশ্ন ওঠেছে। এমনকি সংশ্লিষ্টদের তদারকির অভাবে যাদেরকে পুনর্বাসিত করা হচ্ছে, তারা সবকিছু বিক্রি করে পুনরায় ভিক্ষাবৃত্তিতে ফিরে আসছে। এতে প্রতিবছর সরকারের লাখ লাখ টাকা জলে যাচ্ছে। 

এদিকে সিলেটে কী পরিমাণ মানুষ ভিক্ষাবৃত্তিতে রয়েছেন তার সঠিক পরিসংখ্যান সমাজসেবার অধিদপ্তরের কাছে নেই। তবে সিলেট নগরী ও বিভিন্ন উপজেলা পর্যায়ে ভিক্ষুকদের উপস্থিতি দিন দিন বাড়ছেই। একইসঙ্গে মৌসুমী ভিক্ষুকদের সংখ্যাও চোখে পড়ার মতো।  

সিলেট নগরীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকা, মাজার, হাসপাতাল ও বাসস্ট্যান্ডকেন্দ্রিক ভিক্ষুকের সংখ্যা অহরহ। দূরপাল্লার বাস ও ট্রেনের ভেতরেও ভিক্ষুকদের যন্ত্রণায় অতীষ্ট মানুষজন। এ ছাড়াও বাসাবাড়িতে পর্যন্ত দলবেঁধে ছুটছেন ভিক্ষুকরা। অনেকেই ভিক্ষাবৃত্তিকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। 

বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ২০১০ সালে ভিক্ষুকদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয়। সমাজসেবার তথ্য অনুযায়ী, ২০১০-১১ অর্থবছরে সারাদেশে ভিক্ষুক পুনর্বাসনে বরাদ্দ ছিল ৩ কোটি ১৬ লাখ টাকা। পরবর্তীতে ২০১১-১২ অর্থবছরে ৬ কোটি ৭০ লাখ, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ১০ কোটি, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে এক কোটি, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ হয়। কিন্তু এই সময়ে জরিপ এবং ময়মনসিংহ ও জামালপুর জেলায় পাইলটিং প্রকল্প খাতে অর্থ ব্যয় করা হয়। 

এরপর ২০১৫ সালে স্থানীয়ভাবে শুরু হয় ভিক্ষুক পুনর্বাসনের কাজ। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। তারমধ্যে সব টাকাই ব্যয় করা হয় ভিক্ষুক পুনর্বাসনে। ওই বছর সারাদেশে উপকারভোগীর সংখ্যা ছিল মাত্র ২৫১জন। 

সর্বশেষ বিগত তিন অর্থবছর ধরে ভিক্ষুক পুনর্বাসনে সারাদেশে ১২ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।  

সিলেটে ১০ বছরে বরাদ্দ পৌণে তিন কোটি টাকা 


সিলেটে ভিক্ষুক পুনর্বাসন কার্যক্রমে হতাশাজনক চিত্র ওঠে এসেছে। তথ্যমতে, স্থানীয়ভাবে ভিক্ষুক পুনর্বাসনের কাজ শুরুর পর থেকে সিলেটে বরাদ্দ হয়েছে ২ কোটি ৭৬ লাখ টাকার বেশি। তারমধ্যে সিলেট জেলায় ৫৬ লাখ ৫১ হাজার, মৌলভীবাজারে ৪৪ লাখ, সুনামগঞ্জে ৯৩ লাখ ২৮ হাজার ও হবিগঞ্জে ৮২ লাখ ২৪ হাজার টাকা। 

বরাদ্দকৃত টাকা দিয়ে বিভাগের চার জেলায় এ পর্যন্ত পুনর্বাসিত করা হয়েছে ৮৯৬জন ভিক্ষুককে। তারমধ্যে সিলেটে ১৯০ জন, মৌলভীবাজারে ৯৪ জন, সুনামগঞ্জে ২৯৫ জন ও হবিগঞ্জে ৩১৭ জন।  

সমাজসেবার কর্মকর্তারা বলছেন, পুনর্বাসন কোনো ভিক্ষুককে নগদ অর্থ দেওয়া হয় না। তারা যে কাজে সক্ষম সে কাজের সামগ্রি ক্রয় করে দেওয়া হয়। তবে পুনর্বাসিত করা ভিক্ষুকদের ফলোআপ রিপোর্ট হতাশাজনক নয় বলে মন্তব্য করেছেন কেউ কেউ।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের সিলেট জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক (কার্যক্রম ও সামাজিক নিরাপত্তা) মোহাম্মদ রফিকুল হক বলেন, ‘একেকজন ভিক্ষুককে তার সক্ষমতার ভিত্তিতে সর্বোচ্চ ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত সহায়তা দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ের স্থায়ী বাসিন্দাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, যাতে তারা দোকান বিক্রি করে অন্য কোথাও চলে যেতে না পারে।’ 

তিনি বলেন, ‘এ প্রকল্পের অধীনে বিশেষ করে যারা শারীরিকভাবে অক্ষম কিন্তু কাজ করার সামান্য সক্ষমতা আছে, তাদের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।’ পুনর্বাসিত ব্যক্তিরা ভালো আছেন এবং তারা আর ভিক্ষাবৃত্তিতে ফিরে যাননি বলে জানান তিনি।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের হবিগঞ্জ জেলার উপপরিচালক মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘পুনর্বাসন প্রক্রিয়া প্রত্যাশা অনুযায়ী সফল হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ভিক্ষুকরা সহায়তায় পাওয়া রিকশা বা সম্পদ বিক্রি করে দিয়ে পুনরায় ভিক্ষাবৃত্তিতে ফিরে যায়।’ 

তিনি বলেন, ‘উপজেলা পর্যায়ে— উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের মাধ্যমে সাধারণত ভিক্ষুক নির্বাচন করে ন্যূনতম ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকার মধ্যে মালামাল কিনে দেওয়া হয়। নগদ টাকা কোনোভাবেই দেওয়া হয় না।’ ‘বরাদ্দের টাকা উপজেলায় পর্যায়ে একটি স্ট্যান্ডিং অ্যাকাউন্টে জমা থাকে এবং উপজেলা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী খরচ করা হয় বলেন, হাবিবুর রহমান। 

সমাজসেবা অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক সুচিত্রা রায় বলেন, ‘২০১৫ সাল থেকে এই কার্যক্রম চলছে এবং সিলেট বিভাগে এখন পর্যন্ত ৮৯৬ জনকে পুনর্বাসিত করা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘ভিক্ষুকদের কোনো সরকারি সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই। অনেকে “ভিক্ষা করা যাবে না” এই শর্তে টাকা নিতে চান না। তবে যাদেরকে পুনর্বাসিত করা হয়েছে, তাদেরকে এই কাজে ফিরে না আসতে সর্বোচ্চ সহযোগীতা করা হয়।’


শেয়ার করুনঃ

দৈনন্দিন থেকে আরো পড়ুন

ভিক্ষুক পুনর্বাসন, সমাজসেবা অধিদপ্তর, সিলেট, সরকারি বরাদ্দ, ভিক্ষাবৃত্তি

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ