০৬ মে ২০২৬

কৃষি / চাষাবাদ

হাওরে কাটা ধান নষ্ট হচ্ছে অঙ্কুরোদগমে

প্রতিনিধি, সুনামগঞ্জ

প্রকাশঃ ৬ মে, ২০২৬ ২:৩১ অপরাহ্ন


সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে টানা বৃষ্টি ও অতিবৃষ্টির কারণে মাঠে কাটা ও কাঁচা ধান পানির নিচে তলিয়ে গিয়ে অঙ্কুর গজাতে শুরু করেছে। এতে জেলার কৃষকদের মধ্যে চরম হতাশা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এদিকে দুদিনের রোদে শুকানোর চেষ্টা করেও রক্ষা করা যাচ্ছে না নষ্ট হয়ে যাওয়া ধান। আয়ের প্রধান উৎস ফসল হারিয়ে অনেক কৃষক পরিবার এখন দিশেহারা অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন।


দেখার হাওরের ঝাউয়ার অংশসহ বিভিন্ন হাওর ঘুরে দেখা গেছে, বিস্তীর্ণ এলাকার ধানক্ষেত এখন পানিতে ডুবে আছে। কোথাও কাটা ধানের স্তুপ ভেসে আছে, আবার কোথাও ধানগাছের মাথা পর্যন্ত পানির নিচে চলে গেছে। পানির সঙ্গে কচুরিপানা ও আবর্জনা মিশে পুরো হাওর যেন এক অচেনা জলাভূমিতে পরিণত হয়েছে।


স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে হাওরের পানি দ্রুত বৃদ্ধি পায়। অনেক কৃষক সময়মতো ধান কাটতে পারলেও হঠাৎ পানির চাপ ও ঢলের কারণে সেই ধানও রক্ষা করা যায়নি। কাটা ধান পানির নিচে দীর্ঘ সময় থাকার ফলে এখন সেগুলোতে অঙ্কুর গজাতে শুরু করেছে, ফলে তা আর খাদ্য বা বিক্রির উপযোগী থাকছে না।


হাসন বসত গ্রামের কৃষক ছাদ মিয়া জানান, তিনি আট কেয়ার জমিতে বোরো ধান আবাদ করেছিলেন। এর মধ্যে বড় অংশই পানির নিচে চলে গেছে। তিনি বলেন, “যেটুকু ধান কেটেছিলাম, তার অনেকটাই এখন নষ্ট হয়ে গেছে। পানিতে ভিজে গাছ থেকে বের হয়ে যাচ্ছে নতুন অঙ্কুর। এই ধান আর বাজারে নেওয়া সম্ভব না।”


তার স্ত্রী জমিলা খাতুন বলেন, শুধু ধান নয়, খড়ও নষ্ট হয়ে গেছে। এতে গবাদিপশুর খাদ্য সংকট তৈরি হয়েছে। তিনি জানান, “ঘরে চারটা গরু আছে, কিন্তু খড় না থাকায় তাদের খাওয়ানো কঠিন হয়ে পড়েছে।”


অন্যদিকে হাওরের অনেক স্থানে ধান কাটতে গিয়ে শ্রমিক সংকটও দেখা দিয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির কারণে অনেক শ্রমিক কোমর বা বুকসমান পানিতে নেমে ধান কাটতে রাজি হচ্ছেন না। ফলে যেখানে কিছুটা ধান এখনো বাঁচানো সম্ভব ছিল, সেখানেও কাজ থেমে যাচ্ছে।


ধান কাটার শ্রমিক দলের সরদার নজরুল ইসলাম বলেন, পানিতে নামলে ঠান্ডাজনিত অসুখের ঝুঁকি থাকে। তাই অনেকেই কাজ করতে ভয় পাচ্ছেন। তিনি বলেন, “ক্ষেতের অবস্থা দেখে মনেই হয় না এটা জমি নাকি হাওর। এমন পরিস্থিতিতে কেউই ঝুঁকি নিতে চায় না।”


কালিপুর গ্রামের কৃষক সাদিকুর রহমান জানান, ঋণ করে আবাদ করা জমির বড় অংশ হারিয়ে তিনি এখন দিশেহারা। তিনি বলেন, “আড়াই কেয়ার জমির মধ্যে দুই কেয়ার পানিতে ডুবে গেছে। কিছু ধান কাটলেও তা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এখন আর কিছুই অবশিষ্ট নেই বললেই চলে।”


শুধু কৃষকরাই নয়, ধান মাড়াইয়ের যন্ত্র মালিকরাও এবার বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন। সাধারণত এই মৌসুমে প্রতিটি মেশিন দিয়ে বিপুল পরিমাণ ধান মাড়াই করা হলেও এবার তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। অনেক মালিকই মেশিন প্রস্তুত করতে যে খরচ করেছেন, তা পর্যন্ত উঠছে না।


একজন মেশিন মালিক সিরাজ মিয়া বলেন, প্রতি বছর এই সময় ভালো আয় হয়। কিন্তু এবার পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। তিনি বলেন, “মেশিন ঠিক করতে ২০ হাজার টাকার বেশি খরচ করেছি। কিন্তু ধানই নেই, আয়ও নেই।”


ধান মাড়াই শ্রমিক চান মিয়া জানান, একটি মেশিন চালাতে কয়েকজন শ্রমিক লাগে। কিন্তু এবার কাজ কম হওয়ায় তাদের আয় প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।


এদিকে ক্ষতির পরিমাণ নিয়ে বিভিন্ন পক্ষ ভিন্ন তথ্য দিচ্ছে। হাওর বাঁচাও আন্দোলনের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, এবারের মৌসুমে প্রায় ৬০ শতাংশ ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের অভিযোগ, প্রকৃত ক্ষতির চিত্র আরও বেশি হলেও তা কমিয়ে দেখানো হচ্ছে।


অন্যদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় এ পর্যন্ত প্রায় ৭৭ শতাংশ ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে। তবে অন্তত ২০ হাজার হেক্টরের বেশি জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে তারা জানিয়েছে। পরিস্থিতি পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।


হাওরাঞ্চলের কৃষকেরা বলছেন, দ্রুত সরকারি সহায়তা না এলে অনেক পরিবার বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়বে। ফসল হারিয়ে এখন তাদের সামনে একমাত্র প্রশ্ন—এই ক্ষতি কীভাবে পুষিয়ে নেওয়া যাবে।


শেয়ার করুনঃ

কৃষি থেকে আরো পড়ুন

সুনামগঞ্জ হাওর, ধান ক্ষতি, অঙ্কুরোদগম, বোরো ধান, কৃষক সংকট

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ