২৪ এপ্রিল ২০২৬

কৃষি / চাষাবাদ

কাটা বাঁধে নতুন বিপদ, হাওরে ফসল রক্ষার যুদ্ধে কৃষকরা

অপরিকল্পিত ফসল রক্ষা বাঁধই ফসলহানির কারণ, রাবার ড্যামের দাবি কৃষকদের

নোহান আরেফিন নেওয়াজ, শান্তিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ

প্রকাশঃ ২৪ এপ্রিল, ২০২৬ ৯:১৪ অপরাহ্ন


সুনামগঞ্জ জেলার চারটি উপজেলাজুড়ে বিস্তৃত বোরো ফসলের ভাণ্ডার খ্যাত ‘দেখার হাওর’। ৮ হাজার ৯১০ হেক্টর আয়তনের এই হাওরে আবাদি জমির পরিমাণ ২৪ হাজার ২১৪ হেক্টর। যেখানে প্রতি বছর দেড় লাখ মেট্রিক টন ফসল উৎপাদন হয়। জেলার অন্যতম বৃহৎ এই হাওরের কৃষকরা এখন ধান কাটায় ব্যস্ত থাকার কথা থাকলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন।

ফসল ঘরে তোলার সময়ে ফসল রক্ষার লড়াই করতে হচ্ছে তাদের। দেখার হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উথারিয়া বাঁধ দিয়ে প্রবেশকৃত পানি বন্ধে রীতিমতো যুদ্ধ করতে হচ্ছে কৃষকদের।

গত ১২ এপ্রিল টানা বৃষ্টিতে হাওরের অন্তত ২০ শতাংশ জমি তলিয়ে গেলে স্থানীয় কৃষকদের চাপের মুখে উথারিয়া বাঁধ কেটে পানি নামানোর সিদ্ধান্ত নেয় প্রশাসন। এতে সাময়িকভাবে পানি নেমে ফসল কিছুটা রক্ষা পেলেও নতুন করে বিপদ ডেকে আনে সেই সিদ্ধান্ত।

গত তিন দিন ধরে বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে কেটে দেওয়া বাঁধ দিয়ে দেখার হাওরে পানি প্রবেশ করতে শুরু করেছে। হাওরে পানি প্রবেশ ঠেকাতে স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহযোগিতায় বাঁধ পুনর্নির্মাণ কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা।

স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, হাওরের পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না করেই অপরিকল্পিতভাবে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণের কারণেই প্রতিবছর এমন সংকট তৈরি হয়। বৃষ্টির পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে হাওরে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়, ফসল তলিয়ে যায়। জলাবদ্ধতা নিরসনে ঝুঁকি নিয়ে বাঁধ কেটে পানি নিষ্কাশন করা হলেও নদীর পানি বৃদ্ধি পেলে হাওরে পানি প্রবেশ করে। এতে ফসলহানির ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।

স্থানীয়দের দাবি, এই সংকট নিরসনে দেখার হাওরপাড়ের আসামপুর-আস্তমা গ্রামের দুই পাড় সংযুক্ত করে মহাসিং নদীতে রাবার ড্যাম স্থাপন করা গেলে ফসলহানির কবল থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।

দেখার হাওরপাড়ের আস্তমা গ্রামের কৃষক হাবিবুর রহমান ও জমিরুল হক বলেন, দেখার হাওরের ফসলের ওপর আমাদের জীবন-জীবিকা নির্ভরশীল। এই হাওরের ফসল ঘরে তুলতে পারলেই তা দিয়ে আমাদের সংসার চলে। যদি কোনো কারণে হাওরের ফসল তলিয়ে যায়, তাহলে আমাদের দুর্দশার শেষ থাকে না। সে জন্য আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল দেখার হাওরের ফসল রক্ষায় স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা। সেজন্য রাবার ড্যামের বিকল্প নেই।

দেখার হাওরপাড়ের অপর কৃষক সাজাদ মিয়া ও তারেক মিয়া বলেন, ‘২০১৭ সালে সুনামগঞ্জ জেলায় ফসলহানির পর থেকে প্রতিবছর দেখার হাওরের ফসল রক্ষায় কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে বাঁধ নির্মাণ করা হয়। কিন্তু এসব বাঁধ নির্মাণের সময় পানি নিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থা থাকে না। ফলে বৃষ্টি হলে হাওরের ভেতরেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে ফসল তলিয়ে যায়। আবার জলাবদ্ধতা নিরসনে বাধ্য হয়ে বাঁধ কেটে দিলে পরবর্তীতে নদীর পানি হাওরে প্রবেশ করে। এতে পুরো হাওরের ফসল তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।’

তারা আরও বলেন, ‘ফসল রক্ষার জন্য বাধ্য হয়ে বাঁধ কেটে দিলে কৃষকদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিকভাবে মামলা দেওয়া হয়। এই দ্বিমুখী সংকট থেকে রক্ষা পেতে হলে অপরিকল্পিত ফসলরক্ষা বাঁধ না দিয়ে স্থায়ী সমাধান খোঁজা দরকার। এক্ষেত্রে দেখার হাওরের প্রবেশমুখে রাবার ড্যাম স্থাপনের কোনো বিকল্প নেই।’

এদিকে দেখার হাওরের চলমান সংকট নিরসন ও স্থায়ী সমাধান পেতে গত বুধবার (২২ এপ্রিল) উথারিয়া ক্লোজার পরিদর্শন করেছেন সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক, জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাসহ জেলা ও উপজেলার হাওর-সংশ্লিষ্ট দপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তারা।

এ সময় হাওরপাড়ের কৃষক, স্থানীয় রাজনীতিবিদ, গণমাধ্যমকর্মীসহ সচেতন নাগরিকদের সঙ্গে কথা বলেন তারা। হাওরের ফসল রক্ষায় স্থায়ী সমাধানে তাদের মতামত গ্রহণ করেন। এ সময় প্রায় সবাই দেখার হাওরের প্রবেশমুখে রাবার ড্যাম নির্মাণের পক্ষে মত দেন।

হাওর পরিদর্শন শেষে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান বলেন, ‘আমরা দেখার হাওরে পানি প্রবেশের খবর পেয়ে উথারিয়া বাঁধ পরিদর্শনে এসেছি। এখানে তৃণমূল পর্যায় থেকে সমস্যা চিহ্নিত করা এবং সমাধান খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছি। স্থানীয় কৃষকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে আমরা জানতে পেরেছি, এখানে একটি রাবার ড্যাম স্থাপন করা গেলে হয়তো এই সমস্যার একটি স্থায়ী সমাধান সম্ভব। আমরা তাদের দাবি আমলে নিয়ে জরিপ করছি। পানি উন্নয়ন বোর্ডকে সমীক্ষা যাচাইয়ের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সমীক্ষা যাচাইয়ের মাধ্যমে আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে এই বিষয়ে পদক্ষেপ নেব।’

তিনি বলেন, ‘ইতোমধ্যে এই সমস্যা সমাধানে স্থানীয় এমপিও যোগাযোগ করেছেন। আশা করছি, শিগগিরই এই সমস্যার সমাধানে আমরা কাজ শুরু করতে পারব। কৃষকরা নির্বিঘ্নে তাদের ফসল ঘরে তুলতে পারবেন।’

সুনামগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য কয়ছর এম আহমদ বলেন, ‘প্রতিবছরই পুরো জেলায় শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করে ফসল রক্ষার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তাতেও ফসলহানির শঙ্কা কাটে না। কৃষকদের কথা বিবেচনা করে ইতোমধ্যে আমি জাতীয় সংসদে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছি। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করেছি। এই সংকট নিরসনে কৃষকদের মতামতের ভিত্তিতে শিগগিরই দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’


শেয়ার করুনঃ

কৃষি থেকে আরো পড়ুন

শান্তিগঞ্জ, দেখার হাওর, বোরো ধান, কৃষক, হাওরাঞ্চল

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ