ইংরেজি শেখার সেরা ৫ বই: ঘরে বসেই বাড়ান দক্ষতা
যাপিতজীবন
প্রকাশঃ ২০ এপ্রিল, ২০২৬ ১০:২৯ অপরাহ্ন
তেহরানের আকাশজুড়ে তখন যুদ্ধবিমানের গর্জন। চারদিকে মুহুর্মুহু বিস্ফোরণের শব্দ। ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠছিল পরিস্থিতি। এ অবস্থায় দুচোখে কেবল তীব্র ভয় আর আতঙ্ক বিরাজ করছিল অভিবাসী শ্রমিক বাবুল মিয়ার।
যুদ্ধপরিস্থির কারণে একদিকে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ, অন্যদিকে মৃত্যুচিন্তা আর ছুটে আসা ক্ষেপণাস্ত্রের রূঢ় আঘাত। সব মিলিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় দিন গুণা ছাড়া কোন পথ খোলা ছিল না তার।
ঠিক এভাবেই একে একে ইরানের রাজধানী তেহরানের উপকণ্ঠে টানা ২০ দিন কাটিয়েছিলেন হবিগঞ্জের বাবুল মিয়া। শুধু অপেক্ষা করছিলেন কবে যেন মাতৃ কোলে ফিরবেন। অবশেষে বাধ্য হয়েই সিদ্ধান্ত নেন বাংলাদেশের দূতাবাসে পৌঁছার।
এভাবেই যুদ্ধবিদ্ধস্ত ইরানের পরিস্থিতি বর্ণনা করছিলেন অভিবাসী শ্রমিক বাবুল মিয়া। বাবুল মিয়া নবীগঞ্জের পানিউমদা গ্রামের বাসিন্দা। সাত বছর আগে (২০১৯) জুলাই মাসে মধ্যপ্রাচয়ের দেশ ওমানে পাড়ি জমান তিনি।
তবে কয়েক মাস পার হতেই উন্নত জীবনের আশায় সীমান্ত অতিক্রম করে অবৈধভাবে ইরানে প্রবেশ করেন বাবুল মিয়া। আশ্রয় নেন তেহরানের পার্শ্ববর্তী হাসিনাবাদ নামক এলাকায়। সেখানে একটি স্টিল কারখানায় কাজে যোগ দেন বাবুল।
সে সময়কার স্মৃতি স্মরণ করে বাবুল জানান, কারখানায় কাজের সময় প্রায় ৮০ জন বাংলাদেশী শ্রমিক একসঙ্গে গাদাগাদি করে থাকার অভিজ্ঞতা হয়েছিল তার। প্রতিটি কক্ষে ৮ থেকে ৯ জন বসবাস করতেন তারা।
যুদ্ধ পরিস্থিতির স্মৃতি বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘পাখির ঝাঁকের মতো যুদ্ধ বিমানগুলো উড়ছিল। কিছুক্ষণ পর পর ক্ষেপণাস্ত্র ধেয়ে আসছিল। আমি ঘরের ভেতর আটকে ছিলাম। একসময় মনে হলো, এভাবে অপেক্ষা করে মরার চেয়ে জীবন বাজি রেখে দূতাবাসে যাওয়াই ভালো।’
একপর্যায়ে বাংলাদেশ দূতাবাসের সহযোগিতায় আজারবাইজান হয়ে দেশে ফিরেন বাবুল মিয়া।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের উপর যৌথ বিমান হামলা চালায়। সেদিনের বর্ণনা দিতে গিয়ে বাবুল বলেন, ‘রাতের খাবার খেয়ে আমরা প্রতিদিনের মতো সেদিন ঘুমাতে গিয়েছিলাম। ভোর ৫টার দিকে বিকট শব্দে পুরো ভবন কেঁপে ওঠে। তখন আমরা দৌড়ে বাইরে যাই। সতর্কবার্তা বেজে উঠলো। আমরা প্রথমে ভেবেছিলাম মহড়া। পরে জানালা দিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র দেখলাম।’
তিনি আরও বলেন, ‘সকালের মধ্যেই যুদ্ধের গুজব ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু আমাদের কাছে অপ্রতুল তথ্য ছিল। ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় পরিবারের সঙ্গেও যোগাযোগ অসম্ভব হয়ে পড়ে।’
স্কুলে নারকীয় হামলার বিষয়ে বলতে গিয়ে বাবুলের গলা ধরে আসে। তিনি বলেন, ‘আমাদের এলাকার কাছে একটি স্কুলে হামলা হয়। অনেক শিশুরা মারা গিয়েছিল। তখন আমাদের কারখানার পাশেও বোমা পড়েছিল। কি করবো আমরা কিছুই বুঝতেই পারছিলাম। কর্তৃপক্ষেরও কোনো নির্দেশনা ছিল না।’
পরিস্থিতি সহসাই আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠে বাবুলের। সে পরিস্থিতির বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের মধ্যে ভয় যেন এক স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছিলো। প্রতিটি দিন অনিশ্চয়তায় কাটছিল। আতঙ্কে আমরা প্রতিটি রাত নির্ঘুম কাটিয়েছি। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে তেহরানে বন্ধ হয়ে যায়। জিনিসপত্রের দাম অনেক বেড়ে যায়। এমন পরিস্থিতির কথা বলতে গিয়ে বাবুল বলেন, ‘সবমিলিয়ে বেঁচে থাকাও কঠিন হয়ে ওঠে। আমার কাছে তখন টাকা পয়সা ছিল না। কখনো কখনো খাওয়ার মতোও কিছু থাকত না। তবুও কাজ চালিয়ে যেতে হতো। হামলা শুরু হলে আমরা দৌড়াতাম।’
ধীরে ধীরে পরিস্থিতি আরও রুদ্ধশ্বাস হয়ে উঠে। তবে এর মধ্যে আলোর রেখাও দেখতে পান বাবুল। ‘একপর্যায়ে জানতে পারি। বাংলাদেশী দূতাবাস তেহরান থেকে সাময়িকভাবে বাংলাদেশী প্রবাসীদের সাভেহতে স্থানান্তরিত করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমি সঙ্গে সঙ্গে আবেদন করি। যেদিন আবেদন করেছিলাম সেদিন ধার করে অনেকদিন পর ভালোভাবে খেয়েছিলাম।’ বলেন বাবুল।
এর মধ্যেই ৫ মার্চ অল্প সময়ের জন্য ইন্টারনেট চালু হলে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন বাবুল। তিনি বলেন, ‘আমাদের পরিবারের সদস্যরা কাঁদতে কাঁদতে আমাকে দেশে ফেরার কথা বলছিল। কিন্তু ওরা জানত না, আমার কাছে খাবার কেনার মতো টাকাও নেই।’
যুদ্ধ পরিস্থিতির ক্রমেই আরও অবনতি নয়। গভীর রাত পর্যন্ত একের পর এক বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে তেহরানের ভবনগুলোতে। বাবুল বলেন, ‘মনে হচ্ছিল, যে কোনো মুহূর্তে সব শেষ হয়ে যাবে। ১৮ মার্চ একটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় আমাদের পাশের একটি পুলিশ পোস্ট ধ্বংস হয়ে যায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘সকালে গিয়ে দেখি চারদিকে শুধু ধুলা আর ধোঁয়া উড়ছে। সেখানে কতজন মারা গেছে জানি না। আতঙ্কে সারা রাত কেঁদেছি।'
সেদিন সকালেই বাবুলের ফোনে একটি কল আসে। যেখানে বলা হয়, দূতাবাস থেকে তাকে ট্রাভেল পাস দেওয়া হবে।
তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বাবুল মিয়া ও অন্য বাংলাদেশী প্রবাসীরা তেহরান ছেড়ে যাত্রা শুরু করেন। প্রথমে তারা সাভেহ পৌঁছান। তারপর নয়টি বাসের বহরে তারা আসতারা সীমান্তের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান। দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে রাত ২টার দিকে তারা প্রচণ্ড ঠাণ্ডার আবহাওয়ার মধ্যে সেখানে পৌঁছান।
সেই স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে বাবুল বলেন, ‘কোনো কম্বল ছিল না। কেউ বিশ্রামকক্ষে, কেউ খোলা আকাশের নিচে ছিল তখন। কেউই ঘুমায়নি।’
পরদিন ভোরে সীমান্ত অতিক্রম করার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। সীমান্তের ওপারে বাংলাদেশ মিশনের কর্মকর্তারা আগত অভিবাসীদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। এরপর সেখান থেকে তারা বাকু বিমানবন্দরে উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। ২০ মার্চ সন্ধ্যায় একটি বিশেষ ফ্লাইটে তারা দেশের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন এবং ২১ মার্চ ভোরে দেশে পৌঁছান।
মাতৃভূমিতে পা রাখার আনন্দে বাবুল মিয়া বলেন, ‘যখন বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখলাম, মনে হলো যেন নতুন এক জীবন পেলাম।’
তেহরান যুদ্ধ, বাংলাদেশি শ্রমিক, বাবুল মিয়া, অভিবাসী সংকট, ইরান পরিস্থিতি