১৬ এপ্রিল ২০২৬

কৃষি / চাষাবাদ

সুনামগঞ্জের শাল্লা

হাওরে জলাবদ্ধতায় ডুবেছে ২৯২ হেক্টর জমি, ‘স্লুইস গেট’ চান কৃষকেরা

প্রতিনিধি, শাল্লা, সুনামগঞ্জ

প্রকাশঃ ৭ এপ্রিল, ২০২৬ ৭:৩৩ অপরাহ্ন

ছবিঃ টানা বৃষ্টিপাতে জলবদ্ধতায় ডুবে গেচ

টানা কয়েকদিনের বৃষ্টিপাতে সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলায় বিভিন্ন হাওরে বেশকিছু ফসিল জমি তলিয়ে গেছে। বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় হাওরে বড় ধরনের জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে।

  

হাওরের একমাত্র বোরোফসল গোলায় তোলা নিয়ে চরম শঙ্কায় দিন পাড় করছেন হাওর পাড়ের কৃষকেরা। এ অবস্থায় অসময়ে জলাবদ্ধতা থেকে স্থায়ীভাবে মুক্তি পেতে চূড়ান্ত সমাধান চান তারা। 

 

হাওরে জমে থাকা ডুবার পানি নিষ্কাশনের জন্য বেরিবাঁধ কাটছেন কৃষকেরা। ছবি: সংগৃহীত।

কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, জলাবদ্ধতায় উপজেলার ভরাম, ছায়া ও কালিয়ারকোটাসহ ছয়টি হাওরে মোট ২৯২ হেক্টর জমি নিমজ্জিত ও অর্ধ- নিমজ্জিত রয়েছে। তবে বাস্তবে ৪০০ থেকে ৫০০ হেক্টর জমি জলাবদ্ধতার নিমজ্জিত রয়েছে বলে বেশ কয়েকটি সূত্রে জানা গেছে। 
 

সরেজমিনে দেখা গেছে, কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে উপজেলার বিভিন্ন হাওরে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এতে ফসলি জমিগুলো তলিয়ে গেছে। এ অবস্থায় অসময়ে জলাবদ্ধতার হাত থেকে ফসলকে রক্ষা করতে অনেক জায়গায় বেড়িবাঁধ কেটে পানি নিষ্কাশন করছেন স্থানীয় কৃষকেরা। 

 

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সূত্রে জানা গেছে, বৃষ্টির পানিতে সৃষ্টি হওয়া জলাবদ্ধতার পানি নেমে গেলে ফসলের কোন ধরনের ক্ষতি হবে না। 

 

শাল্লা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শুভজিৎ রায় বলেন, এখনো ফসলের কোন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। জলাবদ্ধতার পানি নেমে গেলে নিমজ্জিত জমিগুলোরও কোন ক্ষতি হবে না। যদি পানি নেমে না যায় তাহলে ফসলের ক্ষতি হবে। তখন আমরা খোঁজখবর নিয়ে ক্ষয়ক্ষতির সঠিক পরিমাণ প্রকাশ করবো। 

 

তিনি বলেন, জলাবদ্ধতা থেকে ফসল বাঁচাতে জলাবদ্ধতা দূরীকরণে জেলা প্রশাসককে বলা হয়েছে। এবং সে বিষয়টি জেলা প্রশাসক আমলে নিয়ে আগামী বছর থেকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

 

সরকারি হিসেব মতে, ইতোমধ্যে ডুবে গেছে ২৯২ হেক্টর জমির বোরো ফসল। ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে জলাবদ্ধতার পরিমাণ ব্যাপকহারে বাড়তে পারে।

 

ভান্ডাবিল, ভেড়াডহর, ছায়া সহ বেশ কয়েকটি হাওর সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, বোরোধানে সোনালী বর্ণ শুরু হয়েছে। ১০-১৫ দিন পরই হাওরে ধান কাট শুরু হওয়ার বেশি সম্ভাবনা রয়েছে। তবে যে ফসল নির্বিঘ্নে ঘরে ওঠার কথা, সেখানে এখন কোথাও কোমরপানি, আবার কোথাও বুকসমান পানি। জলাবদ্ধতায় নিমজ্জিত কৃষকেরা জমির দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া অন্য কোনো উপায় দেখছে না।

 

কৃষকদের দাবি, প্রত্যেকটি হাওরের বেড়িবাঁধের পয়েন্টে পয়েন্টে মিনি স্লুইসগেট নির্মাণ করা হলে এই জলাবদ্ধতা নিরসন করা যাবে। কৃষকেরা জানান, স্লুইসগেট স্থাপনের পাশাপাশি হাওরে ভরাট হয়ে যাওয়া বিল ও খাল খনন করা অতি জরুরি।

 

জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানের ব্যাপারে কৃষকেরা জানান, উপজেলার চাপতি বিল, মাউতি, আছানপুর, পাঠাখাউরি, যাত্রাপুর ও কানখলা নামক স্থানসহ কালিয়ারকোটা হাওরের বেড়িবাঁধের বেশ কয়েকটি মিনি স্লুইসগেট নির্মাণ করতে হবে। তাছাড়া উপজেলার ভান্ডাবিল হাওরের কচুয়া নদী, নারকিলার খাল, চাকই বিল, ছায়ার হাওরের মাউতি বিলসহ বেশ কয়েকটি বিল খননের কথাও জানান কৃষকেরা।

 

ভান্ডাবিল হাওরের কৃষক রহমত আলী জানান, ইতিমধ্যেই তার ৪-৫ বিঘা জমি জলাবদ্ধতায় নিমজ্জিত হয়েছে। ধান পরিপক্ব না হওয়ায় সেই জমিগুলো পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। ভান্ডাবিল হাওরের আছানপুর নামক বেড়িবাঁধে মিনি স্লুইসগেট নির্মাণ করা হলে তার মতো আরো শতাধিক কৃষক জলাবদ্ধতা থেকে বাঁচবে বলে জানান তিনি।

 

ভরাম হাওরের কৃষক নিখিল দাশ, দীপক দাস, আমিনুল ইসলাম, কালিয়ারকোটা হাওরের কৃষক কবির মিয়া, মোশাহিদ মিয়া সহ শতাধিক কৃষক জানান জলাবদ্ধতা নিরসনে স্লুইসগেট স্থাপনের পাশাপাশি বিল ও খাল খননের কোন বিকল্প নেই।

 

কৃষক নেতারাও ও হাওর নিয়ে কাজ করা সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দরাও একই কথা বলছেন। হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলন শাল্লা শাখার সদস্য সচিব আনোয়ার হোসেন বলেন, “যে যাই বলুন বোরোধানের দীর্ঘদিনের পুরনো সমস্যা জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান বাঁধের বিভিন্ন পয়েন্টে পয়েন্টে মিনি স্লুইসগেট নির্মাণ করা।”

 

তিনি বলেন, পাহাড়ি ঢলে নদীতে হঠাৎ পানি বেড়ে যাওয়ার ফলে নির্মিত বাঁধ কেটে জলাবদ্ধতা নিষ্কাশনে অনেকটাই ঝুঁকি থাকে। তাই কোন ধরনের ঝুঁকি ছাড়াই জলাবদ্ধতার একমাত্র স্থায়ী সমাধান হিসেবে স্লুইসগেট স্থাপন করা অতিব জরুরি।

 

এটা হাওরাঞ্চলের প্রত্যেকটা কৃষক ও শ্রমিকের প্রাণের দাবি উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের হাওরাঞ্চলে জলাবদ্ধতা নিরসনে স্লুইসগেট নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেওয়ার কোন বিকল্প নেই। 

 

তিনি বর্তমান সরকার, পাউবো সহ দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, এবিষয়টি গুরুত্ব সহকারে আমলে নিয়ে কাজ করলে হাওর ও ফসলের ব্যাপক উন্নয়ন হবে। এবং একমাত্র স্লুইসগেট স্থাপনের মাধ্যমেই হাওরাঞ্চলের কৃষক জলাবদ্ধতা নামক দুর্ভিক্ষ থেকে রক্ষা পাবে।

 

কৃষকদের দাবিকে গুরুত্ব সহকারে নিয়ে হাওরের জলাবদ্ধতা নিয়ে আমরা কাজ করছি উল্লেখ করে পাউবো শাল্লা শাখার উপসহকারী প্রকৌশলী মো: ওবায়দুল হক বলেন, যে যে পয়েন্টে স্লুইসগেট স্থাপন করা দরকার আমরা সেই তালিকা জেলা অফিসে পাঠিয়েছি।

 

হাওরের জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানে স্লুইসগেট ও বিল খননের ব্যাপারে কাজ করছে প্রশাসন উল্লেখ করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পিয়াস চন্দ্র দাস বলেন, ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি স্পট বাচাই করে তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে।

 

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী ইমদাদুল হক বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে বাঁধের যে যে জায়গায় রেগুলেটর বা স্লুইসগেট প্রয়োজন আমরা সেগুলো নিয়ে কাজ করছি।

 

তিনি বলেন, জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানে খাল ও বিল খনন করা গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। আমরা এগুলোর তালিকা উর্ধতন কতৃপক্ষকে পাঠিয়েছি। প্রকল্পটি পাশ হলে জলাবদ্ধতা খুব দ্রুত নিরসন হবে।

 

এ বিষয়ে কথা বলতে সুনামগঞ্জের ডেপুটি কমিশনার (ডিসি) ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়ার সঙ্গে কথা বলতে মুঠুফোনে একাধিকবার কল করলেও তিনি তা রিসিভ না করায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।


শেয়ার করুনঃ

কৃষি থেকে আরো পড়ুন

শাল্লা, হাওর, জলাবদ্ধতা, ফসলি জমি ডুবে গেছে, সুনামগঞ্জ, অতিবৃষ্টি, কৃষক

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ