রোটারিয়ান মো. চাঁন মিয়া
নতুন বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা: নির্বাচন পরবর্তী প্রত্যাশা ও বাস্তবতা
মিন্টু দেশোয়ারা
প্রকাশঃ ২০ মে, ২০২৬ ৪:৩৭ অপরাহ্ন
২০ মে, ১৯২১ সালের সকাল। সিলেট ও আসাম অঞ্চলের প্রায় ৩০ হাজার চা-শ্রমিক ‘মুল্লুক চলো’—বা স্বদেশে ফিরে চলো স্লোগান তুলে চা-বাগান ছেড়ে চাঁদপুরের মেঘনা ঘাটের দিকে হাঁটতে শুরু করেছিলেন।
তাদের লক্ষ্য ছিল সুদৃঢ়, বিহার, ওড়িশা, আসাম এবং আরও যেসব অঞ্চল থেকে উন্নত জীবনের মিথ্যা প্রতিশ্রুতিতে তাঁদের এনে চা বাগানের দাসত্বে বন্দি করে ফেলা হয়েছিল, সেখানে তাঁরা তাদের জন্মভূমিতে ফিরে যেতে পারবেন।
কিন্তু তাঁরা পৌঁছাতে পারেননি। চাঁদপুর ঘাটে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক পুলিশ তাদের উপর নির্বিচারে গুলি চালায়। শতশত শ্রমিক নিহত হন, তাদের মরদেহ নদীতে ছুড়ে ফেলে দেয়া হয়।
বেঁচে যাওয়াদের কেউ পালিয়ে যান, কেউবা ধরা পড়ে নির্যাতনের শিকার হন। আর বাকি হাজারো শ্রমিকের জন্য যাওয়ার আর কোন জায়গা না থাকায় বাগানেই ফিরে আসেন।
Plantation Labour in India (১৯৩১) গ্রন্থে রজনীকান্ত দাস লিখেছেন, ‘ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের দ্বারা কুলিদের লাথি মারা, ঘুষি মারা এবং নানা ধরনের শারীরিক নির্যাতন প্রায়শই চা-বাগানে সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি করত। শুধু ১৮৯১ সালেই আসামের চা-বাগানগুলোতে দাঙ্গা ও সংঘর্ষের ১০৬টি ঘটনা ঘটেছিল।‘
এই প্রতিরোধ বছরের পর বছর চলতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত ১৯২১ সালের বৃহৎ আন্দোলনে বিস্ফোরিত হয়। চা-শ্রমিকরা তাঁদের স্বদেশে ফিরে যেতে চাইছিলেন, এবং এই স্ফুলিঙ্গ দুই উপত্যকার বাগানগুলোয় ছড়িয়ে পড়ে। বিদ্রোহের অন্যতম তাৎক্ষণিক কারণ ছিল শ্রমিকদের মজুরি হ্রাস।
Coolie: The Story of Labour and Capital in India (১৯৩২) গ্রন্থে দেওয়ান চমন লাল লিখেছেন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় চা-বাগানের মালিকরা বিপুল মুনাফা করেছিলেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে যা ছিল ৪৫০ শতাংশ পর্যন্ত। এত বিশাল আয় হওয়া সত্ত্বেও শ্রমিকদের মজুরি একটি আনাও বাড়ানো হয়নি। অথচ যুদ্ধ-পরবর্তী আর্থিক মন্দা শুরু হতেই মজুরি কমিয়ে মাত্র তিন পয়সা দৈনিক করে দেওয়া হয়। তিন আনা পেলেও একটি পরিবারের ভরণ-পোষণ চলত না। তার উপর, বাগান-মালিকরা পুরুষ, নারী ও শিশু নির্বিশেষে সকলকে চাবুক মেরে অমানবিক নির্যাতন করতেন। ফলে অনেক শ্রমিক সিদ্ধান্ত নেন যে তাঁরা নিজেদের জন্মভূমিতে ফিরে যেতে চান। কিন্তু চা-বাগানের মালিকরা তাঁদের যেতে দিতে রাজি ছিলেন না এবং তাই দমন-পীড়ন আরও তীব্র করে তোলেন।
History of the Labour Movement in India (1830-2010) গ্রন্থে সুকোমল সেন বিস্তারিতভাবে মুল্লুকে চলো আন্দোলনের বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, আসামের করিমগঞ্জে ইউরোপীয় রেলওয়ে কর্মকর্তারা নির্দেশ দিয়েছিলেন যাতে শ্রমিকদের কাছে কোনো ট্রেনের টিকিট বিক্রি না করা হয়। ফলে অনেক শ্রমিক পায়ে হেঁটে স্বদেশের পথে রওনা দেন। পরে কলকাতার মেয়র যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্তের হস্তক্ষেপে টিকিট বিক্রি পুনরায় চালু হয়।
আসামের শ্রমিকরা সিলেটের ভেতর দিয়ে চাঁদপুরের মেঘনা নদীবন্দরের দিকে যাত্রা করেন। পথে সিলেটের বিভিন্ন বাগানের চা-শ্রমিকরাও তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন। তাঁদের পরিকল্পনা ছিল মেঘনা ঘাট থেকে স্টিমারে গোয়ালন্দ পৌঁছাবেন এবং সেখান থেকে ট্রেনে করে যে যাঁর জন্মভূমিতে ফিরে যাবেন। কিন্তু ২০ মে, স্বদেশে ফেরার আকাঙ্ক্ষায় উদ্বেলিত শ্রমিকরা এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখোমুখি হন।
রক্তস্নাত সেই দিনটি তখন থেকে ভগ্নস্বপ্ন ও অদম্য প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে উঠেছে—আর এই কারণেই প্রতি বছর ২০ মে বাংলাদেশের চা-শ্রমিকরা পালন করেন ‘চা শ্রমিক দিবস’।
এরপর একশ বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। ব্রিটিশ চলে গেছে, পাকিস্তানিরাও। বাংলাদেশ এখন একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র, চা শিল্প এখানে বিকাশমান—১৬৬টি চা-বাগান, ১,১৬,৭৬২ জনের বেশি নিবন্ধিত শ্রমিক (এবং আরও হাজার হাজার অনিয়মিত শ্রমিক)। তবু রাষ্ট্র আজও ২০ মে-কে আনুষ্ঠানিকভাবে চা শ্রমিক দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি।
আজকের বাংলাদেশে চা কেবল একটি পানীয় নয়—এটি আমাদের সংস্কৃতির অংশ, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের উৎস এবং জাতীয় গৌরবের বিষয়। আর এই প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে পাতা দিয়ে পাতা সাজিয়ে—সেই সব মানুষের শ্রমে, যাঁদের পূর্বপুরুষদের বন্ধুয়া শ্রমিক হিসেবে এখানে নিয়ে আসা হয়েছিল, যাঁদের স্বাধীনতা ও মর্যাদা কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, যাঁদের জঙ্গল কেটে সাফ করতে, চারা লাগাতে এবং বাংলো নির্মাণ করতে বাধ্য করা হয়েছিল—যে বাংলোয় তাঁদের তত্ত্বাবধায়করা আরাম-আয়েশে বাস করতেন।
তাঁদের উত্তরসূরিরা আজও সেই শ্রম অব্যাহত রেখেছেন, দৈনিক ১৮৭ টাকা মজুরিতে এবং কিছু সহায়তা দিয়ে (যার মধ্যে খাবার হিসেবে কিছু রেশন ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা রয়েছে), ‘লেবার লাইনের’ ঘিঞ্জি আবাসে গাদাগাদি করে বাস করছেন, যাদের প্রায়ই স্বাস্থ্যসেবা বা শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়।
২০ মে-কে চা শ্রমিক দিবস হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিতে সরকারের কোনো ব্যয় হবে না, কিন্তু এটি একটি সম্প্রদায়ের কাছে অপরিসীম তাৎপর্য বহন করবে—যে সম্প্রদায়কে এক শতাব্দী ধরে বলে আসা হয়েছে যে তাদের ইতিহাসের কোনো গুরুত্ব নেই।
চা-বাগান সম্প্রদায়গুলোতে রয়েছে কয়েক ডজন স্বতন্ত্র নৃগোষ্ঠী, প্রত্যেকের আছে নিজস্ব ভাষা, গান, আচার ও স্মৃতি। গবেষকরা বাংলাদেশের ১৪টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ভাষাকে বিপন্ন বলে চিহ্নিত করেছেন, এবং এর মধ্যে বেশ কয়েকটি চা-বাগানে বসবাসকারীদের কথ্য ভাষা। শিশুরা স্কুলে বাংলা শিখতে শিখতে বড় হয়, কিন্তু তাদের মাতৃভাষাগুলো বাঁচিয়ে রাখার জন্য পাঠ্যক্রমে কোনো ব্যবস্থা নেই। খারিয়া, সাদরি, মুন্ডারি, কুরুখ, ওরাওঁ—এই ভাষাগুলো ধারণ করে শতাব্দীর ইতিহাস। এগুলো যখন মিলিয়ে যায়, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক মোজাইকের একটি অপরিহার্য অংশও সঙ্গে হারিয়ে যায়। তবে এটি অনিবার্য নয়।
অন্যান্য দেশ সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যেও আদিবাসী ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণের কাঠামো তৈরি করেছে। বাংলাদেশেও এই কাজ করার জন্য প্রতিষ্ঠান রয়েছে—আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়। যা অনুপস্থিত তা হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
চা শ্রমিক দিবসের স্বীকৃতি হবে কেবল শুরু। সরকার এবং চা শিল্পকে শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপও নিতে হবে—যার মধ্যে রয়েছে দৈনিক মজুরি এমনভাবে পুনর্নির্ধারণ করা যা প্রকৃত জীবনযাত্রার ব্যয়কে প্রতিফলিত করে; প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে লেবার লাইনে বসবাসকারী শ্রমিক ও তাঁদের পরিবারের ভূমি-অধিকারের আইনি স্বীকৃতি; চা-শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য প্রকৃত অগ্রগতির পথ তৈরি করে এমন শিক্ষা-সম্পদের বরাদ্দ; এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের আওতায় চা-বাগান সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক ও ভাষিক ঐতিহ্যের সুরক্ষা।
এগুলো কোনো অস্বাভাবিক দাবি নয়, বরং এগুলো হলো এমন মানুষদের প্রতি একটি ন্যায়সংগত সমাজের মৌলিক দায়িত্ব, যাঁরা এই দেশের সংস্কৃতি ও অর্থনীতিতে অবদান রেখেছেন এবং আজও রেখে চলেছেন।
[সিলেট ভয়েস-এ প্রকাশিত অভিমত, মতামত, কলাম ও চিঠিপত্র একান্তই লেখকের নিজস্ব।]