অধ্যাপক মোঃ শাহাদত হোসেন
ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ : একটি বিশ্লেষণ
মো. জিল্লুর রহমান চৌধুরী
প্রকাশঃ ১৩ মে, ২০২৬ ২:২৪ অপরাহ্ন
মানুষ সৃষ্টিগতভাবে সুন্দর।তাকে আরও সুন্দর করে তার অর্জিত জ্ঞান।শিক্ষার মাধ্যমে মানুষ জ্ঞান অর্জন করে।জ্ঞান মানুষকে মহৎ করে।মহত্ত্ব মানুষের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে।মহৎপ্রাণ মানুষ সমাজ আলোকিত করে।আলোকিত মানুষ সমাজের প্রাণশক্তি,এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা।তাঁরা সমাজের অশিক্ষা,কুশিক্ষা,কুসংস্কার,অপসংস্কৃতি,অনাচার এবং সকল ক্ষয় ও লয় প্রতিরোধে মজবুত সুউচ্চ প্রাচীর।তাঁরা শান্তি,স্বস্তি আর প্রগতির নিয়ামক শক্তি।
শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো জ্ঞানার্জন।
শিক্ষা হলো ব্যক্তির মধ্যে যে অমিত সম্ভাবনা বা গুণাবলী আছে তা পরিপূর্ণরূপে বিকশিত করা।যে প্রক্রিয়া বা ব্যবস্থার মাধ্যমে জ্ঞানার্জন করা হয় তা শিক্ষাব্যবস্থা।এই প্রক্রিয়া এমনভাবে সাজানো হয়, যাতে ব্যক্তির সুপ্ত গুণাবলীর বিকাশ ঘটে এবং তার দক্ষতা,সামর্থ বা যোগ্যতা বৃদ্ধি পায়।তার মধ্যে আলোর বিচ্ছুরণ ঘটে।
শিক্ষালব্ধ ব্যক্তি পরিবার,সমাজ এবং রাষ্ট্রের সম্পদ।সঠিক শিক্ষা মানুষকে উন্নত ও দক্ষ মানব সম্পদে পরিণত করে।সমৃদ্ধ সমাজ,দেশ ও জাতি বিনির্মাণে সক্ষম করে গড়ে তোলে।পক্ষান্তরে শিক্ষাহীন,জ্ঞানহীন জনগোষ্ঠী সমাজের বোঝা; দূরাবস্থা বা দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
শিক্ষার মাধ্যম প্রধানত:দু'টি।প্রথমত: বই পড়ে জ্ঞানার্জন এবং দ্বিতীয়ত: স্রস্টার সৃষ্টিকে অবলোকন করে তথা ভ্রমণ করে জ্ঞানার্জন।মানুষ শিখে শিক্ষকের কাছে,সহশিক্ষার্থীর কাছে,পরিবার ও সমাজের কাছে,শিখে নিজ অভিজ্ঞতা থেকে এবং সমগ্র জীবনের কর্মধারা থেকে।মানুষ প্রকৃতির কাছেও শিখে,প্রকৃতিকে বলা হয় মানুষের এক মহান শিক্ষক।
সভ্যতার শুরুতে মানুষ এক সময় প্রকৃতির কাছে অসহায় ছিল।প্রয়োজন তাকে জানতে বা শিখতে বাধ্য করেছে।পাথর মসৃণ করে বা সুচালো করে আঘাত করলে প্রাণী শিকার করা সহজ হয়; এটি মানুষ বাঁচার তাগিদে শিখেছে।হাজার কিলোমিটার মানুষ হেঁটেছে আর সে দুর্গমতা আর কষ্ট মানুষকে দ্রুত গতির উড়োজাহাজ বানাতে উজ্জীবিত করেছে।মানুষের প্রয়োজন মানুষকে চিন্তা,গবেষণায় অনুপ্রাণিত করেছে;যার ফলাফল হাজারো আবিষ্কার,সর্বশেষ আজকের আইসিটি ও এআই প্রযুক্তি ইত্যাদি অভিনব সব অর্জন।
সভ্যতার উষালগ্ন থেকে মানুষ অজানাকে জানার চেষ্টায় রত।প্রাতিষ্ঠানিক অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার যে মাধ্যমে মানুষ যা পেয়েছ তাই প্রথমে বৃক্ষের পাতায় বা পাথরে লিখে রেখেছে এবং ক্রমে ক্রমে তা পুস্থকাবদ্ধ করে পাঠাগারে ধরে রেখেছে।অজানাকে জানার আশায় বা অজেয়কে জয় করার বাসনায় মানুষ ভ্রমণ,পরিভ্রমণ বা মহাকাশ অভিযানে বেরিয়েছে।যা দেখেছে,যা জয় করেছে সে বিজয়ের গল্প কিংবা যেখানে ব্যর্থ হয়েছে সে ব্যর্থতার কাহিনী জয়ের সিঁড়ি হিসেবে সঞ্চয় করে রেখেছে।প্রজন্মের পর প্রজন্মের এই ধারা মানুষের জানা বা অভিজ্ঞতার ঝুলি সমৃদ্ধ করে চলেছে।সেই পাঠাগার,তত্ত্ব ও তথ্যভান্ডার আজ মানুষের জ্ঞানের বড় উৎস।আজও মানুষ থেমে নেই।চলছে মানুষের জানার অভিযাত্রা,জ্ঞানার্জনের পথে অদম্য গবেষণা।এটিই মানবজাতির জীবনধারা; সভ্যতা,প্রগতি ও সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রা এইপথেই এগিয়ে যাবে।
শান্তি,স্বস্তি আর অগ্রগতির অন্বেষণে নীতি,নৈতিকতা,মূল্যবোধ,মানবিকতা, পরিবার,সমাজ,রাষ্ট্র,পরিবেশ,বিজ্ঞান প্রযুক্তি,ধর্ম ও কর্ম ইত্যাদি সবকিছুই মানুষের শিক্ষা তথা জ্ঞানার্জনের উপজীব্য বিষয়।
মানুষকে আরও সুন্দর,আরও মানবিক,আরও উদার হতে হবে। মানুষ হবে অহিংসাপরায়ণ।সে ভালবাসবে,ভালবাসাবে।বিচ্ছেদ নয় বরং দৃঢ় করবে মানুষে মানুষে মেলবন্ধন।সে আরও মহিমান্বিত করে সাজাবে তার সমাজ,সভ্যতা ও জীবন।তার জানার শেষ নেই,দেখার শেষ নেই,অভিজ্ঞতার অন্ত নেই,নেই জ্ঞানার্জনের পরিসমাপ্তি।এই জীবনে মানুষের সামনে রয়েছে সীমা,পরিসীমাহীন এক মহাজগৎ।এ জগৎ সম্পর্কে তাকে জানতে বলা হয়েছে।এই মহাজগৎ তাকে ঘুরে ঘুরে দেখতে বলা হয়েছে।মানুষ যতই জানবে,যতই দেখবে;মানুষ ততই সমৃদ্ধ হবে,তার রঙ,রূপ বদলে যাবে,তার জীবন হবে আরও সৌন্দর্যমন্ডিত,সমাজ হবে আরও ঐশ্বর্যময়।তাই,মানুষের জানার চেষ্টা চলছে এবং তা চলবে অবিরাম।
বলা হয়,শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড।বলা হয়,যে জাতি যত শিক্ষিত সে জাতি তত উন্নত।নেপোলিয়ন বোনাপার্ট বলেছেন,'তুমি আমাকে শিক্ষিত মা দাও আমি তোমাকে শিক্ষিত জাতি দিব'।উইল এন্ড এরিয়াল ডুরান্ট বলেছেন,'শিক্ষা হলো সভ্যতার রূপায়ণ'।স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন,'মানুষের অন্তর্নিহিত বিকাশই হলো শিক্ষা'।বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন,'মনুষ্যত্বের শিক্ষাটাই চরম শিক্ষা আর সমস্তই তার অধীন '।মহাত্মা গান্ধী বলেছেন,'এমনভাবে বাঁচো যেন কাল তুমি মরবে- এমনভাবে শেখ যেন তুমি সর্বদা বাঁচবে '।সৈয়দ মুজতবা আলী বলেছেন ,'বই কিনে কেউ কোনদিন দেউলিয়া হয় না'।সক্রেটিস বলেছেন,'শিক্ষা হলো মিথ্যার অপনোদন ও সত্যের বিকাশ' কিংবা 'শিক্ষা হচ্ছে আত্মোপলব্ধি'। এরিস্টটল বলেছেন, 'শিক্ষা হলো সুস্থ দেহে সুস্থ মন'।আমাদের জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম বলেছেন ,' যে শিক্ষা ছেলেদের দেহ মন দুইকেই পুষ্ট করে তাহাই হইবে আমাদের শিক্ষা '।মহানবী (স:) বলেছেন,'দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত মানুষের শিক্ষাকাল'।মহান স্রস্টা বলেন,পড় তোমার প্রভুর নামে যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন;যিনি শিক্ষা দিয়েছেন কলমের মাধ্যমে; মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন যা সে জানত না'।শিক্ষা এবং জ্ঞানার্জন সম্পর্কে এ সবই মানুষের আলোর পথের তাগিদ।ভালো থাকা,সুখে থাকার সূত্র,সমৃদ্ধি আর অগ্রযাত্রার পাথেয়,মানুষের মুক্তির সোপান।
মানুষ হয়ে জন্মানোতে মানুষের কোন ভূমিকা নেই;বরং জন্মের পর মানুষের কাজ হলো মানুষ হওয়া।আবার একথাও বলা হয় যে,'মানুষের জন্য সবচেয়ে কঠিন কাজ মানুষ হওয়া'।সেই কঠিন লক্ষ্যই মানুষকে অর্জন করতে হবে।মানুষকে বলা হয়েছে অজানাকে জানার জন্য,সৃষ্টিকে দেখার জন্য,সৃস্টির নিদর্শনগুলো উপলব্ধি করা;তা নিয়ে চিন্তা বা গবেষণা করার জন্য।মানুষ সে পথ ধরে চললে সফলতা পাবে।যে জাতি তা উপলব্ধি করতে পেরেছে তারা সফলতা পেয়েছে।যারা এ সত্য থেকে বিচ্যুত হয়েছে,দারিদ্র্য,ক্ষুধা,অশিক্ষা কুশিক্ষা,ব্যর্থতা আর বিশৃঙ্খলা তাদের গ্রাস করেছে।
শিক্ষায় মুক্তি,জ্ঞানই শক্তি।পৃথিবীতে এখন ১৯৫ টি দেশ আছে।তার মধ্যে মাত্র ৪০টির মতো দেশ উন্নত। তাদের মানব উন্নয়ন সূচক(HDI) এক তথা শতভাগের কাছাকাছি। তাদের শতভাগ নাগরিক শিক্ষিত। তাদের শিক্ষাব্যবস্থা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জগৎ বিখ্যাত।অক্সফোর্ড,ক্যাম্ব্রিজ,হার্ভাড ও
এমআইটি ইত্যাদি জগৎ বিখ্যাত বিদ্যাপীঠ সবই তাদের অর্জন।
শিক্ষা তথা জ্ঞানজগতের প্রতিটি শাখায় তাদের অগ্রগতি ঈর্ষনীয়।গবেষণা এবং গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফল উল্লেখযোগ্য।তাদের প্রায় শতভাগ নাগরিক উন্নত ও অগ্রসর মানব সম্পদ।তারা তাদের নাগরিকদের সকল মৌলিক অধিকার পূরণ করে উচ্চভোগের জীবন উপহার দিতে পেরেছ।রয়েছে সুশাসন,ন্যায়বিচার এবং সম্পদ ও জীবনের নিশ্চয়তা ও নিরাপত্তা।সাহিত্য,সংস্কৃতি,অর্থনীতি তথা জ্ঞান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সকল শাখায় তাদের সদর্পে বিচরণ।
বিশ্বের সকল সেরা স্বীকৃতিগুলো তাদের একচ্ছত্র দখলে। ১৪৯২ সালে যে আমেরিকার আবিষ্কার হয় এবং ১৭৭৬ সালে স্বাধীন হয়,২৫০ বছরের নিরলস প্রচেষ্টায় তারা আজ বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ জাতি। ৪২০ টির বেশি নোবেল পুরষ্কার তাদের ঝুড়িতে।যে জাপান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রায় ধ্বংস হয়ে গেল,মাত্র চার দশকের মধ্যে তারা ঘুরে দাঁড়ালো বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে। সুইডেন,নরওয়ে,জার্মানি,যুক্তরাজ্য,রাশিয়াসহ সকল উন্নত দেশের শিক্ষার হার প্রায় শতভাগ এবং তারা গুণগত,মানসম্মত ও যুগোপযোগী শিক্ষায় শিক্ষিত।
পক্ষান্তরে যাঁরা তাদের নাগরিকদের নূন্যতম মৌলিক অধিকারগুলো পূরণ করতে পারছে না তাদের মূল সমস্যা দূর্বল জনশক্তি বা মানব সম্পদ। তারা তাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে মজবুত কাঠামোর মধ্যে দাঁড় করাতে পারছে না।সে কারণে তারা অভ্যন্তরীণ বা বহিসম্পদ আহরণে অক্ষম,তাদের অর্থনীতিও দুর্বল।সেই সঙ্গে রয়েছে নানা বহিস্থ প্রভাব এবং অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা।এসব দেশের মানব উন্নয়ন সূচক অনেক নীচে।অর্থাৎ মানুষের জীবনযাত্রার মান ভালো নয়।
এই মানব উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশ অনেক পিছনে।মাত্র একশতে ৬৭ (২০২২) এবং ১৯৩ টি দেশের মধ্যে ১২৯ তম।আমাদের দেশের শতভাগ লোক শিক্ষিত নয়।যারা শিক্ষিত তাদের শিক্ষার গুনগত মান কোন মাত্রার সে বিষয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা,পাঠ্যক্রম,
শিক্ষার পরিবেশ,ছাত্র,শিক্ষক এবং অভিভাবক সম্পর্ক শিক্ষা সহায়ক কিনা এবং বিশ্বায়নের এই যুগে কাঙ্ক্ষিত মানের শিক্ষা প্রদানে এটি কতটুকু সক্ষম তা খতিয়ে দেখার অবকাশ রয়েছে।
আমাদের শিল্প,সাহিত্য,জ্ঞান,বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ইত্যাদি সকল শাখায় কতটুকু গবেষণা হচ্ছে তা পরীক্ষা নিরীক্ষা করা প্রয়োজন।শিক্ষাব্যবস্থা বা শিক্ষাকাঠামো বিশ্বমানের না হলে যেমন দেশের মেধাবীদের ধরে রাখা যায় না,তেমনি দুর্বল অর্থনীতির দেশে নানা অনিশ্চয়তার কারণে তারা শিক্ষার্জন শেষে আর নিজ দেশে ফিরেও আসে না।যারা দেশে থেকে যায় তারা কতটুকু দক্ষ ও উৎপাদনশীল জনশক্তি বা কতটুকু কর্মক্ষম মানব সম্পদ তাও বিবেচনার বিষয়।
দেশের সামগ্রিক অগ্রগতির জন্য প্রয়োজন একটি শিক্ষিত,দেশপ্রেমিক ও জাতীয়তাবাদী ঐক্যবদ্ধ জাতি।প্রয়োজন একটি স্থিতিশীল সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা।প্রয়োজন সুশাসন ও ন্যায় বিচারের নিশ্চয়তা।যেখানে হবে আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যত।যুগোপযোগী শিক্ষা কাঠামো ও শিক্ষা সহায়ক পরিবেশে শিক্ষার্থী,শিক্ষক সবাই থাকবে বিদ্যালয়মুখী,পাঠাগার অনুরাগী,গবেষণা তথা জ্ঞানার্জনে আসক্ত।
মহান স্রস্টা বলেন ,' ধর্ম ও নৈতিকতার শিক্ষা সন্তানের জন্য সবচেয়ে বড় সম্পদ '।আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন যে,'সততাহীন দক্ষতা বিপদজনক আবার দক্ষতাহীন সততাও মূল্যহীন'।কিংবা ধর্মহীন শিক্ষা বা কর্মহীন ধর্ম দু'টিই অসম্পূর্ণ।
আমাদের এই উর্বর সরল মাটিতে পরিপূর্ণ শিক্ষা চাই।যে শিক্ষা হবে ধর্ম,কর্ম,নীতি,নৈতিকতা আর মানবিকতায় পুষ্ট;সাহিত্য,সংস্কৃতিতে ঋদ্ধ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গবেষণায় সমৃদ্ধ।সে শিক্ষাই দিতে পারে আমাদের উন্নত জীবনমান,সমৃদ্ধ সমাজ ও নিরাপদ জীবন।সেই জ্ঞানই শক্তি,সেই শিক্ষাই হবে আমাদের শান্তি,স্বস্তি ও মুক্তির সোপান।সেটিই আমাদের আরাধ্য পথ হওয়া উচিত।
[সিলেট ভয়েস-এ প্রকাশিত অভিমত, মতামত, কলাম ও চিঠিপত্র একান্তই লেখকের নিজস্ব।]