তীব্র গরমে বিদ্যুতের ঘাটতি ঊর্ধ্বমুখী, ঘনঘন লোডশেডিংয়ে সিলেটে বাড়ছে ভোগান্তি
দৈনন্দিন
প্রকাশঃ ১২ আগস্ট, ২০২৬ ১০:১৬ অপরাহ্ন
সিলেটে দিন দিন বাড়ছে বিদ্যুৎ ঘাটতির মাত্রা। গত এক সপ্তাহের পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ৫ আগস্ট থেকে ১২ আগস্ট পর্যন্ত প্রতিদিনই চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থেকেছে, আর এই ঘাটতির প্রবণতা সামগ্রিকভাবে ঊর্ধ্বমুখী। ঠিক এই সময়েই সিলেটে বইছে তীব্র তাপপ্রবাহ, ফলে ঘনঘন লোডশেডিংয়ে চরম ভোগান্তির মধ্যে পড়েছেন নগরবাসী।
সিলেট বিভাগীয় বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড অফিসের তথ্য অনুযায়ী, গেল এক সপ্তাহের মধ্যে ৫ আগস্ট রাত ১টায় ১৫৭ মেগাওয়াট সরবরাহের বিপরীতে ঘাটতি ছিল ৫০ মেগাওয়াট, যা ওই দিন রাত ৮টায় কমে দাঁড়ায় ৪১ মেগাওয়াটে (সরবরাহ ২০৫ মেগাওয়াট)। এরপর থেকে ঘাটতির পরিমাণ মোটের ওপর বাড়তে থাকে। ৬ আগস্ট রাত ১টায় ঘাটতি ছিল ২১ মেগাওয়াট, রাত ৮টায় তা বেড়ে হয় ৩৫ মেগাওয়াট। ৭ আগস্ট রাত ১টায় ঘাটতি আরও কমে ১৫ মেগাওয়াটে নামলেও রাত ৮টায় ফের বেড়ে দাঁড়ায় ৩০ মেগাওয়াটে।
তবে ৮ আগস্ট থেকে পরিস্থিতির স্পষ্ট অবনতি ঘটে। ওই দিন রাত ১টায় ঘাটতি ছিল ২৫ মেগাওয়াট, রাত ৮টায় সরবরাহ কমে ১৮৬ মেগাওয়াটে নেমে আসায় ঘাটতি বেড়ে দাঁড়ায় ৬১ মেগাওয়াটে। ৯ আগস্ট রাত ১টায় ঘাটতি ছিল ৫২ মেগাওয়াট, রাত ৮টায় তা আরও বেড়ে হয় ৫৫ মেগাওয়াট। আর ১০ আগস্ট রেকর্ড করা হয় গত এক সপ্তাহের সর্বোচ্চ ঘাটতি রাত ৮টায় ২০৪ মেগাওয়াট সরবরাহের বিপরীতে ঘাটতি দাঁড়ায় ৬৮ মেগাওয়াটে।
এরপর ১১ আগস্ট রাত ৮টায় সরবরাহ কিছুটা বেড়ে ২২১ মেগাওয়াট হলেও ঘাটতি ছিল ৪৫ মেগাওয়াট। সর্বশেষ ১২ আগস্ট রাত ১টায় ১৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের বিপরীতে ঘাটতি রেকর্ড করা হয় ৫১ মেগাওয়াট। অর্থাৎ সপ্তাহের শুরুতে যেখানে ঘাটতি ছিল ১৫ থেকে ৫০ মেগাওয়াটের মধ্যে, শেষদিকে তা বেড়ে ৪৫ থেকে ৬৮ মেগাওয়াটে গিয়ে ঠেকেছে।
এই ঘাটতির সময়টিতেই সিলেটে তাপমাত্রা রয়েছে ঊর্ধ্বমুখী। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার (১২ আগস্ট) সিলেটের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৫.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, সর্বনিম্ন ২৪.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সকাল ৯টায় আর্দ্রতা ছিল ৭৫ শতাংশ এবং সন্ধ্যা ৬টায় ৭২ শতাংশ। উচ্চ তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার এই যুগলবন্দিতে গরমের অনুভূতি আরও তীব্র হয়ে উঠেছে, আর ঠিক তখনই ঘনঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে জনজীবনে নেমে এসেছে বাড়তি দুর্ভোগ। দিনে-রাতে সমানতালে এক ঘণ্টা পরপর বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার অভিযোগ করছেন নগরবাসী, কোথাও কোথাও টানা দুই ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকারও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বিশেষ করে শিশু ও বয়স্করা পড়েছেন সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যাহত হচ্ছে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও অফিসের স্বাভাবিক কার্যক্রম, বিপাকে পড়েছেন ব্যবসায়ী ও চাকুরিজীবীরাও।
লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবিতে গত রোববার রাতে সিলেট সদর উপজেলার খাদিমপাড়া ও নগরীর টুকেরবাজার এলাকায় সড়ক অবরোধ করে আন্দোলন করেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
সিলেট নগরীর বালুচর এলাকার বাসিন্দা নাজমুল ইসলাম বলেন, আমি রিমোট জব করি, যার জন্য আমাকে প্রতিনিয়ত ইন্টারেটের সাথে সংযুক্ত থাকতে হয়। কিন্তু গেল কয়েকদিন ধরে যা শুরু হয়েছে তাতে না দিনে কারেন্ট পাচ্ছি না রাতে। ঘন্টার পর ঘন্টা কারেন্ট থাকে না। এতে করে আমার কাজেও যেমন ক্ষতি হচ্ছে সেই সাথে বাসার ফ্রিজে রাখাগুলোও নষ্ট হচ্ছে। ফ্রিজে এক বোতল পানিও ঠান্ডা হতে পারছে না কারণ ঘন্টায় ঘন্টায় লোডশেডিং।
নগরীর দরগা গেইট চন্দনটুলা এলাকার বহুতল ভবনের মালিক লোকমান আহমদ বলেন, আমার বাসায় বেশিরভাগ ব্যাচেলর ছেলেরা থাকে। এখানে থেকে কেউ আইএলটিএস করতে এসেছে কেউ চাকরি করতেছে। কিন্তু গেল কয়েকদিন হল সিলেটে যে পরিমাণ লোডশেডিং হচ্ছে তাতে আমরা কেউ ভালো নেই। ব্যাচেলর ছেলেদের খাবারের জন্য আমার বাসায় আলাদা ফ্রিজ আছে তারা সেখানে বাজার থেকে আনা মাছ মাংস রাখে। গতকাল (মঙ্গলবার) যে পরিমান লোডশেডিং হয়েছে ফ্রিজের অনেক জিনিস তাদের সামনেই ফেলে দিতে হয়েছে। বিদ্যুতের এমন ভোগান্তি আধুনিক যুগে এসেও দেখতে সেটা ভাবি নাই, আমরা না হয় হারিকেন যুগের মানুষ কিন্তু এখনকার ছেলে-মেয়েরাতো এসব বুঝবে না একেতো অতিরিক্ত গরম তার উপর লোডশেডিং তাদের অনেক কষ্ট হয়।
ঝর্নারপাড় এলাকার বাসিন্দা খানম আক্তার বলেন, দিনে-রাতে কয়েকবার করে বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। একবার বিদ্যুৎ গেলে কখন আসবে, তারও ঠিক থাকে না। গরমের মধ্যে ছোট বাচ্চা ও বয়স্কদের নিয়ে খুব কষ্টে থাকতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকায় পানির মোটর চালানো যায় না, রান্নাবান্না ও ঘরের অন্যান্য কাজেও সমস্যা হচ্ছে। এভাবে ঘনঘন লোডশেডিং চলতে থাকলে মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়বে। আমরা চাই, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত সমস্যার সমাধান করে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করুক।
সিলেট বিভাগীয় বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী ইমাম হোসেন বলেন, সুরক্ষার জন্য উৎপাদন স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এটা মেনটেইন করতে হবে। লোডশেডিং তো কারো কাম্য না, আমারও কাম্য না। আমাদের সিস্টেম সুরক্ষার জন্য যতক্ষণ পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বাভাবিক না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত ফ্রিকোয়েন্সি মেনটেইন করার জন্য শেডিং করার প্রয়োজন হয়। এনএলডি আমাকে যেটা বরাদ্দ দেয়, সেটা আমি বণ্টন করি।
তিনি জানান, বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার অবহিত করা হয়েছে। তারা দেখতেছেন, কী করা যায়। জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়লে লোডশেডিংয়ের মাত্রাও কমে আসবে।
বিদ্যুৎ ঘাটতি, লোডশেডিং, তীব্র গরম, সিলেটের ভোগান্তি, বিদ্যুৎ সরবরাহ, তাপমাত্রা