বানিয়াচংয়ে গণভোট-জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে ১১ দলীয় জোটের গণমিছিল
সংগ্রাম-স্বাধীনতা
প্রকাশঃ ৫ আগস্ট, ২০২৬ ৯:০৩ অপরাহ্ন
জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্ণ হয়েছে। ২০২৪ সালের সেই আন্দোলনের স্মৃতি এখনও তাজা সিলেটজুড়ে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন যখন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়, তখন সিলেটের রাজপথও পরিণত হয়েছিল সংঘর্ষ, গুলিবর্ষণ ও প্রাণহানির এক রক্তাক্ত অধ্যায়ে। আন্দোলনের সময় সিলেট জেলায় প্রাণ হারান অন্তত ২২ জন। তবে সরকারি শহীদের তালিকায় স্থান পেয়েছেন ১৪ জন। নিহতদের মধ্যে কয়েকজন এখনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির বাইরে রয়ে গেছেন। একই সঙ্গে আন্দোলনের সময় নিখোঁজ হওয়া এক অটোরিকশাচালকের সন্ধানও মেলেনি দুই বছরেও।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানে সিলেট বিভাগের চার জেলায় মোট ৩৩ জনকে শহীদ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে সিলেট জেলার ১৪ জন, হবিগঞ্জের ১৬ জন এবং সুনামগঞ্জের ৩ জন রয়েছেন।
তবে আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, সিলেট জেলায় নিহতের প্রকৃত সংখ্যা ২২। সরকারি তালিকার বাইরে রয়েছেন কোতোয়ালি থানা কম্পাউন্ডে নিহত সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক পঙ্কজ কুমার কর, গোয়াইনঘাটে নিহত তিনজন এবং লালাবাজারে নিহত স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা। পাশাপাশি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দক্ষিণ সুরমা থানা থেকে নিখোঁজ হওয়া অটোরিকশাচালক মোহাম্মদ শাহজাহানের সন্ধানও আজ পর্যন্ত মেলেনি।
সিলেটে আন্দোলনের প্রথম প্রাণহানির ঘটনা ঘটে ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই। সেদিন সন্ধ্যায় শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ধাওয়া দেয় পুলিশ। ধাওয়া এড়াতে গিয়ে খালে পড়ে মারা যান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রুদ্র সেন। আন্দোলনে সিলেটের প্রথম নিহত ব্যক্তি ছিলেন তিনি।
পরদিন ১৯ জুলাই নগরের কোর্ট পয়েন্ট থেকে জিন্দাবাজার অভিমুখে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের মিছিল চলাকালে পুলিশের গুলিতে নিহত হন সাংবাদিক এটিএম তুরাব। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) গোলাম কাওসার দস্তগীর কনস্টেবলের কাছ থেকে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে গুলি ছোড়েন। গুলিতে গুরুতর আহত তুরাবকে হাসপাতালে নেওয়া হলেও সেদিন সন্ধ্যায় তিনি মারা যান। তার শরীরে ৯৮টি স্প্লিন্টার বিদ্ধ হয়েছিল বলে চিকিৎসা সূত্রে জানা যায়।
আগস্টের শুরুতেই আন্দোলন আরও তীব্র হয়ে ওঠে। ৪ ও ৫ আগস্ট সিলেট নগরের কোর্ট পয়েন্ট, জিন্দাবাজার, চৌহাট্টা, আম্বরখানা, আখালিয়া, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ছাড়াও জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভ।
সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাণহানির ঘটনা ঘটে ৪ আগস্ট গোলাপগঞ্জে। মসজিদে মসজিদে মাইকে ঘোষণা দিয়ে হাজারো মানুষ রাজপথে নামলে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে বিজিবি ও পুলিশ গুলিবর্ষণ করে। ঘটনাস্থলেই নিহত হন নাজমুল ইসলাম, তাজউদ্দীন, গৌছ উদ্দিন, মিনহাজ আহমদ ও সানি আহমদ। গুরুতর আহত জয় আহমদকে সিলেটের ইবনে সিনা হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
পরদিন ৫ আগস্ট সিলেট নগরে আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন কামরুল ইসলাম পাবেল। একই দিনে কোতোয়ালি থানা কম্পাউন্ডে নিহত হন অটোরিকশাচালক পঙ্কজ কুমার কর। বিয়ানীবাজারেও সংঘর্ষে নিহত হন তারেক আহমদ, ময়নুল ইসলাম ও সোহেল আহমদ। এ সময় টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও গুলিবর্ষণে শতাধিক মানুষ আহত হন।
একই সময়ে গোয়াইনঘাটে নিহত হন ফেনাইকোনা গ্রামের তরুণ ব্যবসায়ী সুমন মিয়া, পশ্চিম জাফলংয়ের ইসলামাবাদ গ্রামের শ্রমিক নাহেদুল এবং পান্থুমাই গ্রামের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী সিয়াম আহমদ রাহিম। লালাবাজারে আন্দোলনের সময় পুলিশের গাড়িচাপায় প্রাণ হারান এক স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা। তবে এসব নিহতদের কেউই সরকারি শহীদের তালিকায় স্থান পাননি বলে অভিযোগ রয়েছে।
আন্দোলনের বিজয়ের দিন ৫ আগস্ট দক্ষিণ সুরমা থানা এলাকা থেকে অটোরিকশাচালক মোহাম্মদ শাহজাহানকে নিয়ে যাওয়ার পর তিনি নিখোঁজ হন বলে অভিযোগ রয়েছে। দুই বছর পেরিয়ে গেলেও তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় সূত্র জানায়, শাহজাহানের স্ত্রী পরে সন্তানকে রেখে অন্যত্র বিয়ে করেছেন। প্রথমদিকে অটোরিকশা শ্রমিক ইউনিয়ন তার সন্ধানে আন্দোলন করলেও পরে তা থেমে যায়। শাহজাহানের ভাগ্যে কী ঘটেছিল, সেটি এখনো অজানা। তাকে হত্যা করে গুম করা হয়ে থাকতে পারে, এমন আলোচনা স্থানীয়ভাবে থাকলেও এর কোনো আনুষ্ঠানিক সত্যতা নিশ্চিত হয়নি।
শহীদ মিনহাজ আহমদের মা সিতাই বেগম বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থানে আহত মানুষকে উদ্ধার করতে গিয়ে আমার ছেলে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হয়েছে। আমি ছেলে হত্যার বিচার দেখে মরতে চাই।’
শহীদ তাজউদ্দিনের মৃত্যুর পর তার স্ত্রী দুই কন্যাসন্তান, ইশা জান্নাত তানহা ও খাদিজা জান্নাতকে নিয়ে জীবনসংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। পরিবারটির সদস্যদের ভাষ্য, সন্তানরা এখনো বাবার ফেরার অপেক্ষায় থাকে।
শহীদ সানি আহমদের মা রাবিরা বেগম বলেন, ‘আমার ছেলে ছাত্র জনতার মিছিলে গিয়ে গুলিতে শহীদ হয়েছে। আমি সন্তানের হত্যাকারীদের বিচার দেখে যেতে চাই।’
শহীদ নাজমুল ইসলামের মা চায়না বেগম বলেন, ‘আমার ছেলে আন্দোলনে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে মারা যায়। আমি আমার ছেলে হত্যার বিচার চাই।’
তার ভাই ছামিদ আহমেদ অভিযোগ করে বলেন, ‘তৎকালীন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) অভিজিৎ চৌধুরীর নির্দেশে বিজিবির গুলিতে আমার ভাই মারা যান। আমার ভাইকে কোনো সাধারণ মানুষ হত্যা করেনি। সেখানে বিজিবি, পুলিশ ও ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন।’
শহীদ কামরুল ইসলাম পাবেলের বাবা রফিক উদ্দিন ও মা দিলারা বেগমও এখনো সন্তানের শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি। দুই বছরেও বিচার না হওয়ায় তারা হতাশা প্রকাশ করে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
তারা বলেন, ‘দুই বছর পেরিয়ে গেলেও এখন আমার ছেলে হত্যার বিচার পাইনি। মামলারও তেমন অগ্রগতি নেই। আমার ছেলে ও অন্য যারা হত্যার শিকার হয়েছেন, তাদের হত্যাকারীদের চিহ্নিত করে সরকার যেন বিচার নিশ্চিত করে। ২০২৪ সালের মতো রক্তক্ষয়ী দিন আর কখনো বাংলাদেশে না আসে।’
শহীদ গৌছ উদ্দিনের ভাই আবুল কালাম বলেন, ‘আমার ভাই গৌছ উদ্দিন শহীদ হয়েছে। তাকে তো আর আমরা ফিরে পাব না। আমার ভাইসহ যারা মারা গেছেন, যারা আহত হয়েছেন আমরা তাদের সঠিক বিচার চাই। কিন্তু দুই বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো ন্যায়বিচার পাইনি।’
জুলাই গণঅভ্যুত্থান, আগস্ট গণঅভ্যুত্থান, সিলেট গণঅভ্যুত্থান, জুলাই আন্দোলন , আগস্ট ২০২৪ , সিলেটে শহীদ, শহীদের তালিকা, শহীদের স্বীকৃতি