১১ জুন ২০২৬

তথ্যপ্রযুক্তি-শিক্ষা / উদ্ভাবন

হাজার কোটি টাকার ক্ষতি ঠেকাতে হাওরে আসছে নতুন ধানের জাত

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশঃ ১০ জুন, ২০২৬ ১০:৩৩ অপরাহ্ন

ছবিঃ ফাইল ছবি

সুনামগঞ্জ থেকে শুরু করে নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জ প্রতিবছর বর্ষার আগেই পাহাড়ি ঢল আর অকাল বন্যায় তলিয়ে যায় হাওরের বোরো ধান। কৃষকের বুকভাঙা কান্না আর শূন্য গোলার দৃশ্য যেন হাওরাঞ্চলের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই দীর্ঘদিনের দুঃখের চক্র ভাঙতে এবার নতুন আশার বার্তা নিয়ে এসেছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)। 

 

প্রতিষ্ঠানটির উদ্ভাবিত নতুন ওই উচ্চফলনশীল ধানের জাতের নাম ‘ব্রি ধান-১১৮’। ধানের এ জাতটি প্রচলিত সময়ের চেয়ে প্রায় দুই মাস আগে রোপণ ও কর্তন করা সম্ভব। ফলে বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই কৃষকেরা ফসল নিরাপদে ঘরে তুলতে পারবেন বলে আশা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

 

চলতি বছর পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ। মাত্র নয় দিনের অবিরাম বৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জসহ দেশের সাত জেলার হাওরে ৪৯ হাজার ৭৩ হেক্টর জমির বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৬ এপ্রিল থেকে ৪ মে পর্যন্ত সৃষ্ট বন্যা ও জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন দুই লাখ ৩৬ হাজার ৮১১ জন ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও বর্গাচাষি। মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় এক হাজার ৪৭ কোটি টাকা।

 

সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত হয়েছে সুনামগঞ্জ, যেখানে ধানের আর্থিক ক্ষতি একাই প্রায় ৫১৮ কোটি টাকা। এ ছাড়া নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

 

হাওরে বোরো ধানের ক্ষয়ক্ষতির ইতিহাস আরও দীর্ঘ ও উদ্বেগজনক। ২০১৭ সালের ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতি হয়েছিল প্রায় পাঁচ হাজার ৩০০ কোটি টাকার ফসল। ২০২২ সালেও ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ১০০ কোটি টাকা। আর চলতি বছর তা আবার ছাড়িয়ে গেছে এক হাজার কোটি টাকা।

 

এই বাস্তবতায় ব্রি ধান-১১৮ হাওরাঞ্চলের কৃষিতে আমূল পরিবর্তন আনতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ব্রি'র জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. রেজওয়ান ভূঁইয়া জানান, এই জাতের ধান কার্তিক মাসে, অর্থাৎ ২৫ অক্টোবর থেকে ৫ নভেম্বরের মধ্যে রোপণ করা যাবে। শীতসহনশীল হওয়ায় ধানগাছ স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠবে এবং বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই ফসল কাটা সম্ভব হবে।

 

তিনি বলেন, ‘হাওরাঞ্চলের কৃষকেরা বছরের পর বছর অকাল বন্যার কারণে ক্ষতির মুখে পড়ছেন। নতুন এই জাত আগাম রোপণ ও আগাম কর্তনের সুযোগ তৈরি করবে, যা কৃষকদের ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে দেবে।’

 

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) উপপরিচালক (বীজ বিপণন) কৃষিবিদ মো. হুমায়ূন কবীর জানান, ব্রি ধান-১১৮ দ্রুত কৃষকদের কাছে পৌঁছে দিতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আগামী মৌসুম থেকেই কৃষকেরা এই বীজ সংগ্রহ করতে পারবেন।

 

সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. আবদুল আজিজ বলেন, ‘হাওরাঞ্চলের জন্য এটি একটি যুগান্তকারী উদ্ভাবন। বর্ষার আগেই ধান ঘরে তোলা গেলে কৃষকদের আর ফসল হারানোর শঙ্কায় থাকতে হবে না। দীর্ঘদিনের এই বড় সমস্যার কার্যকর সমাধান হতে পারে এই জাত।’


শেয়ার করুনঃ

তথ্যপ্রযুক্তি-শিক্ষা থেকে আরো পড়ুন

ব্রি ধান-১১৮, হাওরাঞ্চল, বোরো ধান, অকাল বন্যা, কৃষি গবেষণা

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ