০৯ জুন ২০২৬

অনিয়ম-দুর্নীতি

কৃষক সহায়তার তালিকায় চেয়ারম্যান-নেতাদের নাম, বিক্ষোভে বন্ধ বিতরণ কার্যক্রম

প্রতিনিধি, ধর্মপাশা, সুনামগঞ্জ

প্রকাশঃ ৫ জুন, ২০২৬ ১১:২২ পূর্বাহ্ন


সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার পাইকুরাটি ইউনিয়নে বোরো ফসলহানিতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য সরকারের মানবিক সহায়তার তালিকা প্রণয়নে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত নন কিংবা ফসলহানির শিকার হননি এমন ব্যক্তিদের নামও তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এমনকি তালিকায় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, স্থানীয় বিএনপির নেতা এবং তাদের স্বজনদের নামও রয়েছে।


এ নিয়ে ক্ষোভে ফুঁসে ওঠেন বঞ্চিত কৃষকেরা। তাদের বিক্ষোভের মুখে বৃহস্পতিবার নির্ধারিত সহায়তা বিতরণ কার্যক্রম শুরুই করা যায়নি। একপর্যায়ে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হক পরিষদ কার্যালয় ত্যাগ করেন।


উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, চলতি বছর অতিবৃষ্টির কারণে হাওরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে পাইকুরাটি ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকার বোরো ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর মানবিক সহায়তা কর্মসূচির আওতায় ইউনিয়নের ৮৮৬ জনের একটি তালিকা তৈরি করা হয়।


তালিকা যাচাই-বাছাইয়ের জন্য গত ১০ মে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) একটি কমিটি গঠন করেন। কমিটির আহ্বায়ক করা হয় ইউপি চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হককে। উপ সহকারী কৃষি কর্মকর্তা প্রশান্ত বিশ্ব শর্মা ছিলেন সদস্যসচিব। এছাড়া পাইকুরাটি ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক মাহাবুব মোর্শেদ খোকন ও যুগ্ম আহ্বায়ক হারুন অর রশিদ সরকার, ইউপি সদস্যবৃন্দ, ইউনিয়ন প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তাকে সদস্য করা হয়।


গত বুধবার রাতে তালিকা প্রকাশের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে। স্থানীয়দের অভিযোগ, তালিকায় প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বাদ দিয়ে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি ও তাদের স্বজনদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।


তালিকাভুক্তদের মধ্যে রয়েছেন ইউপি চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হক, তার ছোট ভাই সাজ্জাদুল হক জুয়েল, ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক মাহাবুব মোর্শেদ খোকন, তার ছোট ভাই নিক্সন তালুকদার এবং তাদের চাচাতো ভাই এম এম রেজা (পহেল)। একই ব্যক্তির নাম ‘এস এম রেজা’ পরিচয়ে তালিকার অন্য একটি ক্রমিকেও রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। পহেল সর্বশেষ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীক নিয়ে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।


এছাড়া তালিকায় আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতনের ছোট ভাই মোবারক হোসেন যতন, তার চাচাতো ভাই উজ্জ্বল মিয়া, খায়রুল ইসলাম ও তোফায়েল আহমেদের নামও রয়েছে। 
স্থানীয়দের দাবি, খায়রুল ইসলাম ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য নুরুজ্জামানের আপন ছোট ভাই। আর মোবারক হোসেন যতন, উজ্জ্বল মিয়া ও তোফায়েল আহমেদ তার চাচাতো ভাই।


অভিযোগ রয়েছে, তালিকায় ৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. মনবুলসহ এমন কয়েকজনের নামও রয়েছে, যারা কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত নন অথবা ফসলহানির শিকার হননি।


বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় ইউনিয়ন পরিষদ প্রাঙ্গণে সহায়তার টাকা ও চাল বিতরণের কথা ছিল। তবে সকাল থেকেই বঞ্চিত কৃষকেরা সেখানে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। তাদের দাবি, তালিকা সংশোধন না করে কোনো ধরনের সহায়তা বিতরণ করা যাবে না। একপর্যায়ে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে বিতরণ কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়।


নওধার গ্রামের কৃষক কাজী নূর বলেন, “ওয়ার্ড বিএনপি নেতা আবু শ্যামা আকন্দ ঢাকায় একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করেন। তিনি এখন কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত নন। আবার ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মনবুলের কোনো জমিই নেই। অথচ তাদের নাম তালিকায় আছে।”


পাইকুরাটি গ্রামের বাসিন্দা নয়ন মনি বলেন, “এই সহায়তা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের জন্য এসেছে। কিন্তু তালিকায় চেয়ারম্যান-মেম্বারদের আত্মীয়স্বজনের নাম। নিজেদের লোকজনকে দিলে প্রকৃত কৃষক কোথায় যাবে?”


একই গ্রামের কৃষক আব্দুল বারেক বলেন, “আমার ৪০ কাঠা জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। কিন্তু আমার নাম তালিকায় নেই। কেন নেই, তার কোনো উত্তর পাইনি।”


অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে যাচাই-বাছাই কমিটির সদস্য ও পাইকুরাটি ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক মাহাবুব মোর্শেদ খোকন বলেন, “আমার গ্রামে প্রায় ৪০০ কৃষক। সেখানে মাত্র ৫০টি কার্ড এসেছে। কাকে রেখে কাকে দেব? এ কারণে আমি কমিটির কার্যক্রমে ছিলাম না। তালিকা প্রণয়নে আমার কোনো সম্পৃক্ততা বা স্বাক্ষর নেই। তবে আমি ও আমার ভাই ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক।”


ইউপি চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হক বলেন, তাকে যাচাই-বাছাই কমিটিতে সাধারণ সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছিল। এ কারণে তিনি তালিকায় স্বাক্ষর করেননি। তালিকায় নিজের ও স্বজনদের নাম থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, “স্বজনপ্রীতি কিছু থাকবেই। আমি নিজেও একজন কৃষক। আমার নাম তালিকায় থাকতেই পারে।”


এদিকে বঞ্চিত কৃষকরা তালিকা পুনরায় যাচাই বাছাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন।


শেয়ার করুনঃ

অনিয়ম-দুর্নীতি থেকে আরো পড়ুন

ধর্মপাশা, পাইকুরাটি ইউনিয়ন, বোরো ফসলহানি, কৃষক সহায়তা, মানবিক সহায়তা কর্মসূচি, কৃষকের তালিকা, অনিয়মের অভিযোগ

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ