ঈদের ছুটিতে সিলেটে পর্যটক কম, খালি হোটেল-হাউসবোট
যাপিতজীবন
প্রকাশঃ ২৯ মে, ২০২৬ ৯:০৩ অপরাহ্ন
ঈদুল আজহার ছুটিকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর দেশের অন্যতম পর্যটন অঞ্চল সিলেটে দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেলেও এবার চিত্র অনেকটা ভিন্ন। শুক্রবার (২৯ মে) ঈদের দ্বিতীয় দিনে সিলেট, মৌলভীবাজার ও সুনামগঞ্জ তিন জেলার পর্যটনকেন্দ্রগুলো ছিল অনেকটাই ফাঁকা।
বিশেষ করে সিলেটের জাফলং ও সাদা পাথরে প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম পর্যটক ছিল। এতে করে পর্যটন ব্যবসায়ী, রিসোর্ট মালিক, হাউসবোট ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক, দোকানদারসহ স্থানীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।
পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মতে, ঈদের পর ছুটি কম থাকা, ট্রেনের টিকিট সংকট, দেশের বিভিন্ন এলাকায় হামের সংক্রমণ এবং যোগাযোগ দুর্ভোগের কারণে এবার পর্যটক কম এসেছেন। সিলেটের হোটেল-মোটেলগুলোর অন্তত ৬০ শতাংশ কক্ষ ফাঁকা রয়েছে বলে জানিয়েছেন পর্যটন সংশ্লিষ্টরা।
পবিত্র ঈদুল আযহাকে কেন্দ্র করে এবারও পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হওয়ার কথা ছিল সিলেটের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র জাফলং। তবে প্রত্যাশার তুলনায় পর্যটক উপস্থিতি অনেকটাই কম বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টরা।
সাধারণত ঈদের ছুটিতে এখানে হাজার হাজার পর্যটকের ভিড় দেখা যায়। কিন্তু এবারের চিত্র কিছুটা ভিন্ন। পর্যটকদের উপস্থিতি কম থাকায় হোটেল-মোটেল, রেস্টুরেন্ট, নৌকা ব্যবসায়ী ও ক্ষুদ্র দোকানিরা পড়েছেন হতাশায়।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, যাতায়াত ব্যয় বৃদ্ধি এবং টানা বৃষ্টির কারণে অনেক পর্যটক ভ্রমণ পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছেন। ফলে ঈদকে ঘিরে যে ব্যবসার আশা করেছিলেন, তা পূরণ হয়নি।
তবে যারা আসছেন, তারা উপভোগ করছেন জাফলংয়ের অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য—পাহাড়, নদী আর পাথরের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। পর্যটকদের নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
একই অবস্থা সিলেটের সাদা পাথর পর্যটন কেন্দ্রে। বিগত সময়ের তুলনায় এবার পর্যটকের সংখ্যা অনেক কম ছিল বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। যারা ছিলেন তারা বেশিরভাগই স্থানীয় পর্যটক।
একই অবস্থা মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল, বিভিন্ন চা বাগান ও পর্যটনকেন্দ্রে। পর্যটন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অন্যান্য বছরের তুলনায় পর্যটকের উপস্থিতি অনেক কম। বিকেলের দিকে কিছু স্থানীয় দর্শনার্থী এলেও দূরদূরান্ত থেকে আসা পর্যটকের সংখ্যা ছিল হাতেগোনা। অথচ ঈদ কিংবা দীর্ঘ ছুটিতে সাধারণত জেলার রিসোর্ট ও হোটেলগুলো আগাম বুকিংয়ে পূর্ণ থাকে।
পর্যটন ব্যবসায়ীরা জানান, এবার শুরু থেকেই বুকিং কম ছিল। শেষ সময়ে কিছু বুকিং এলেও অনেকেই আবার তা বাতিল করেছেন। এতে ঈদকেন্দ্রিক ব্যবসার বড় প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।
ঘুরতে আসা আবিদ হাসান ও জমশেদ মিয়া বলেন, ‘মৌলভীবাজারে অনেকবার এসেছি। এখানে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, চা বাগান, পাহাড়ি পরিবেশ ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতি দেখতে সবসময় পর্যটকদের ভিড় থাকে। কিন্তু এবার জায়গাগুলো অস্বাভাবিকভাবে ফাঁকা লাগছে।’
শ্রীমঙ্গল পর্যটন সেবা সংস্থার সাবেক সভাপতি ও গ্র্যান্ড সেলিম রিসোর্টের মালিক সেলিম আহমেদ জানান, ‘হামের প্রভাব ও ঈদের পর ছুটি কম থাকায় পর্যটক কম এসেছে। আগাম বুকিংও আশানুরূপ হয়নি। আবার অনেক বুকিং শেষ মুহূর্তে বাতিল হয়েছে।’
ট্যুরিস্ট পুলিশ শ্রীমঙ্গল জোনের ইনচার্জ (পরিদর্শক) মো. কামরুল হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘পর্যটকদের নিরাপত্তায় কয়েক স্তরের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে অন্য বছরের তুলনায় এবার পর্যটক কম।’
এদিকে হাওর জেলা সুনামগঞ্জেও একই চিত্র। ঈদকে সামনে রেখে টাঙ্গুয়ার হাওর, নীলাদ্রি লেক, বারিক্কা টিলা ও যাদুকাটা নদীকেন্দ্রিক পর্যটন ব্যবসা নতুনভাবে সাজানো হলেও পর্যটকের দেখা মিলছে না। বিশেষ করে বিলাসবহুল হাউসবোটগুলো প্রস্তুত রাখা হলেও অধিকাংশই খালি পড়ে আছে।
জানা গেছে, চলতি মৌসুমে সুনামগঞ্জে শতাধিক ছোট-বড় হাউসবোট প্রস্তুত রাখা হয়। প্রতিবছর ঈদের পর এসব হাউসবোটে পর্যটকদের ভিড় থাকলেও এবার সেই চিরচেনা ব্যস্ততা নেই। স্থানীয় কিছু দর্শনার্থী ছাড়া অধিকাংশ পর্যটন এলাকা প্রায় জনশূন্য।
পর্যটনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, নৌপথ পুরোপুরি সচল না হওয়াও একটি বড় কারণ। অনেক পর্যটক ভ্রমণের পরিকল্পনা বাতিল করেছেন। এতে হাউসবোট মালিক, মাঝি, রিসোর্ট ব্যবসায়ী, ফটোগ্রাফার, খাবারের দোকানদার ও পরিবহন শ্রমিকদের আয় কমে গেছে।
নীলাদ্রি লেক এলাকার বাসিন্দা আক্তার হোসেন বলেন, ‘অন্য বছর ঈদের ছুটিতে পর্যটকদের ভিড় লেগেই থাকে। এবার দোকানে বেচাকেনা নেই বললেই চলে।’
বারিক্কা টিলা এলাকার বাসিন্দা জুবান মিয়া বলেন, ‘ঈদের সময় এখানে অনেক পর্যটক আসত। অথচ এবার এখনও তেমন কাউকে দেখা যায়নি।’
পর্যটন খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, পর্যাপ্ত ছুটির সুযোগ এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি কমে এলে আবারও সিলেট অঞ্চলের পর্যটন শিল্প ঘুরে দাঁড়াবে। তবে এবারের ঈদ মৌসুমে প্রত্যাশিত পর্যটক না আসায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
সিলেট হোটেল-মোটেল ও গেস্ট হাউস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সুমাত নুরী জুয়েল বলেন, ঈদকে ঘিরে সিলেটের হোটেল-মোটেলগুলো ৩০-৩৫ শতাংশ আগাম বুকিং হয়েছে। অথচ ঈদ মৌসুমে সাধারণত শতভাগ বুকিং থাকে। এবার খুব বেশি পর্যটক আসবে মনে হচ্ছে না। অনেকেই ফোন করে রুমের খোঁজ নিচ্ছেন। কিন্তু যাতায়াত পরিস্থিতি শুনে পরে আর বুকিং দেননি।
পর্যটন, সিলেট, ঈদের ছুটি