দূষণে দমবন্ধ সুতাং: নদীজুড়ে বিষ, ঝুঁকিতে মানুষ ও খাদ্যশস্য
প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ
প্রকাশঃ ২৫ এপ্রিল, ২০২৬ ২:১৩ অপরাহ্ন
এক সময় হবিগঞ্জের মানুষের জীবন-জীবিকার কেন্দ্র ছিল সুতাং নদী। মাছ ধরা, কৃষিকাজ সবকিছুই ঘিরে ছিল এই নদীকে। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই নদী এখন ভয়াবহ দূষণের কবলে পড়ে অস্তিত্ব সংকটে।
শিল্পায়নের বিস্তার এবং অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে নদীর পানির স্বাভাবিক গুণাগুণ প্রায় বিলীন। তীরবর্তী এলাকাগুলোতে ছড়াচ্ছে তীব্র দুর্গন্ধ, বাড়ছে চর্মরোগ ও শ্বাসকষ্টসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি। স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীর পানি এখন ব্যবহারযোগ্য তো নয়ই, বরং ক্ষতিকর হয়ে উঠেছে।
সম্প্রতি হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় পরিচালিত দুটি গবেষণায় উঠে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র। গবেষণায় নদীর পানি, মাছ এবং পরিবেশগত অবস্থা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। যেখানে স্বাভাবিক মাত্রা হওয়া উচিত কমপক্ষে ৫ পিপিএম, সেখানে শায়েস্তাগঞ্জের শিল্পাঞ্চল এলাকায় তা নেমে এসেছে ২.৪৭ পিপিএম-এ। এতে জলজ প্রাণীর বেঁচে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
একই সঙ্গে নদীর পানিতে ভারী ধাতুর উপস্থিতি বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছেছে। গবেষণায় লেডের পরিমাণ স্বাভাবিকের তুলনায় ২৪ গুণ বেশি পাওয়া গেছে। ক্যাডমিয়াম ১.৫ গুণ, ম্যাঙ্গানিজ ২.৩৫ গুণ এবং আয়রন প্রায় ৮ গুণ বেশি শনাক্ত হয়েছে। এসব উপাদান নদীর জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করছে।
আরেকটি গবেষণায় উঠে এসেছে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণের ভয়াবহতা। নদী থেকে সংগৃহীত ৩০টি মাছের পরিপাকতন্ত্র বিশ্লেষণে ৫১টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে অর্থাৎ প্রতিটি মাছে গড়ে প্রায় দুটি কণা। শুধু মাছেই নয়, প্রতি লিটার পানিতে ৬ থেকে ৪৬টি পর্যন্ত ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়েছে, যেগুলোর আকার ০.১ থেকে ০.৫ মিলিমিটার। এ ধরনের কণা সহজেই খাদ্যচক্রে প্রবেশ করে মানবদেহে পৌঁছাতে পারে।
গবেষক সাকির আহমেদ জানান, নদীর উজানে দূষণ তুলনামূলক কম থাকলেও শিল্পাঞ্চলসংলগ্ন ভাটির দিকে পরিস্থিতি ভয়াবহ। বিশেষ করে যেখানে সরাসরি শিল্পবর্জ্য নদীতে মিশছে, সেখানে জীবনের কোনো চিহ্নই পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, গবেষক ইফতেখার আহমেদ ফাগুন সতর্ক করে বলেন, নদীর ভারী ধাতু শুধু পানিতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না তা খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করছে। মাছের মাধ্যমে যেমন মানুষের শরীরে যাচ্ছে, তেমনি এই পানি দিয়ে সেচ দেওয়া জমির ধানেও জমা হচ্ছে। ফলে চালের মাধ্যমে তা ছড়িয়ে পড়ছে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে।
হবিগঞ্জ, সুতাং নদী, দূষণ, কৃষিকাজ