১৬ এপ্রিল ২০২৬

ব্যবসা-বাণিজ্য / অর্থনীতি

শত কোটি টাকা ছাড়াল চা শ্রমিকদের পিএফ বকেয়া, অনিশ্চয়তায় হাজারো পরিবার

গোলাম কিবরিয়া জুয়েল, শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার

প্রকাশঃ ১২ এপ্রিল, ২০২৬ ৮:৪৩ অপরাহ্ন

ছবিঃ চা পাতা সংগ্রহে ব্যস্ত সময় পার করছেন নারী শ্রমিকরা। সিলেট ভয়েস

দেশের চা শিল্পে শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার অন্যতম ভরসা প্রভিডেন্ট ফান্ডের (পিএফ) শত কোটি টাকা বকেয়া থাকায় চরম অনিশ্চয়তায় রয়েছেন হাজারো শ্রমিক। দীর্ঘদিন ধরে শ্রমিকদের বেতনের একটি অংশ কেটে এই তহবিলে জমা রাখার কথা থাকলেও অভিযোগ উঠেছে ৫৮টি চা বাগান মালিক এই প্রভিডেন্ট ফান্ডের বিপুল অঙ্কের টাকা জমা দেয়নি। 

 

এ অবস্থায় অবসরের পর কিংবা জরুরি প্রয়োজনে নিজেদের সঞ্চিত অর্থ পাওয়া নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় ভোগছেন চা শ্রমিকরা।

 

শ্রমিকদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে দেয়া হলেও কার্যকর কোনো সমাধান মেলেনি। অনেক শ্রমিক অবসরের কাছাকাছি চলে এসেছেন, কিন্তু সঞ্চিত অর্থ হাতে পাবেন কি-না সেই শঙ্কায় দিন কাটাতে হচ্ছে।

বাগান থেকে চা সংগ্রহ করছেন শ্রমিকরা। ছবি: সিলেট ভয়েস

চা শ্রমিক ভবিষ্য তহবিল নিয়ন্ত্রকের অফিস সূত্রে জানা গেছে, নিয়মিত চা শ্রমিকদের বেতনের ৭.৫ ভাগ কর্তন করে নেয়া হয়। বাগান কর্তৃপক্ষ আরো ৭.৫ ভাগ মোট ১৫ ভাগ অর্থ তহবিলে জামা দেয়ার কথা রয়েছে। শ্রমিক ও মালিক পক্ষের প্রদেয় মোট ১৫ শতাংশ জমা টাকার উপর আরো ১৫ ভাগ অর্থ বাগান কর্তৃপক্ষকে প্রশাসনিক ব্যয় হিসেবে একত্রে জমা দিতে হয়।

 

শ্রম অধিদপ্তরের অতিরিক্ত সচিবকে চেয়ারম্যান করে গঠিত একটি ট্রাস্টি বোর্ড এই ভবিষ্য তহবিল পরিচালনা করেন। বোর্ডে চা বাগান মালিক পক্ষের ৩জন, চা স্টাফ এসোসিয়েশন থেকে ১ জন, চা শ্রমিক ইউনিয়ন থেকে ২ জন প্রতিনিধি এবং চা শিল্প বহির্ভুত ২ জন স্বতন্ত্র বিশিষ্ট ব্যক্তি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। শ্রম সচিবে হয়ে ভবিষ্য তহবিল নিয়ন্ত্রক দায়িত্ব পালন করেন। নিয়ন্ত্রক অফিস সূত্রে জানা গেছে- বোর্ড শ্রমিকদের পক্ষে অনাদয়ী বকেয়া আদায়ে বাগান মালিকদের সাথে দেন দরবার ও মামলা বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়ে থাকে।

 

ভবিষ্য তহবিল নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের ২৮ ফেব্রুয়ারীর হালনাগাদ তথ্য মতে, ৫৮টি চা বাগানের শ্রমিকদের পিএফ এর টাকা বকেয়া রয়েছে। এর মধ্যে ইমাম-বাওয়ানী ৬৯ মাসের ৮৯ লাখ ৭৩ হাজার ৫১৩ টাকা, লোবাছড়া ২৬ মাসের ২১ লাখ ১৩ হাজার ৯৬৩ টাকা, হোসেনাবাদ ২৬ মাসের ৩১ লাখ ২৪ হাজার ৬৮০ টাকা, দলই ২১ মাসের ১ কোটি ৩০ লাখ ৩৭ হাজার ৯৮১ টাকা, রাজনগর ২১ মাসের ২ কোটি ১৯ লাখ ১৬ হাজার ৪৯৩ টাকা এবং মুরইছড়া চা বাগানের ২২ মাসের ৩৫ লাখ ৩৭ হাজার ৪০৮ টাকা বকেয়া আদায়ে শ্রম আদালতে মামলা চলমান রয়েছে। যার পরিমান ৫ কোটি ২৭ লাখ ৪ হাজার ৩৮ টাকা। বাকি ৫২টি চা বাগানের বকেয়া আদায়ে কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানা গেছে। বাকি ৫২ বাগানের বকেয়ার পরিমান জানাতে পারেনি তহবিল নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়। শ্রমিক ইউনিয়ন ও চা বাগান ষ্টাফ এসোসিয়েশনের সূত্রে এই বকেয়ার পরিমান শত কোটি টাকার ছাড়িয়ে যাবে বলে জানান।

 

চা সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, কিছু বাগানে আর্থিক সংকটের কারণে পিএফের টাকা সময়মতো জমা হয়নি। আবার কোথাও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও তদারকির অভাবও দায়ী বলে মনে করা হচ্ছে।

 

চা শ্রমিক ইউনিয়নের সহ-সভাপতি পঙ্কজ কুন্দ বলেন, চা শ্রমিকদের আয় এমনিতেই কম। তার মধ্যেও সামান্য টাকা প্রভিডেন্ট ফান্ডে জমা রাখা হয়, সেটিও পাওয়া যদি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে তবে শ্রমিকদের জীবনে বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি করবে। এনিয়ে আমরা মালিক পক্ষ ও তহবিল নিয়ন্ত্রকের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে যাচ্ছি।

 

বকেয়া তালিকায় থাকা সাতগাঁও চা বাগানের ব্যবস্থাপক সিদ্দিকুর রহমান বলেন, নানা কারণে দীর্ঘদিন ধরে বাগানে লোকসান গুনতে হচ্ছে। উৎপাদন খরচ থেকে চা’য়ের দাম কম। তবে শিঘ্রীই শ্রমিকদের পিএফ’র বকেয়া জমা দিতে পদক্ষেপ গ্রহন করেছি।

 

জানতে চাইলে ভবিষ্য তহবিল নিয়ন্ত্রক মহব্বত হোসাইন বলেন, ৫ ও ৭ জুলাই ট্রাষ্টি বোর্ডেও ৪৪০তম বোর্ড সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অনাদায়ী অর্থ আদায়ে তাগিত পত্র প্রেরণ ও বাগানের আর্থিক পরিস্থিতি সরেজমিন পরিদর্শন করা হয়েছিল। এর ফলে সর্বশেষ ২৮ ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত অনাদায়ী ১০ কোটি টাকা আদায় সম্ভব হয়েছে। 


তিনি বলেন, কিছু বাগান লোকসানের মুখে পড়েছেন, অন্যদিকে শ্রমিকদের স্বার্থও দেখা হচ্ছে। সব কিছু বিবেচনায় রেখে আমরা অনাদায়ী আদায়ে কাজ করে যাচ্ছি।’ 

  


শেয়ার করুনঃ

ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে আরো পড়ুন

চা, চা শিল্প, চা শ্রমিক, শ্রীমঙ্গল, সিলেট, বেতন বকেয়া

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ