রামিসা হত্যা মামলায় আইনজীবী হিসেবে লড়বেন সিলেটের শিশির মনির
দৈনন্দিন
প্রকাশঃ ১৬ ডিসেম্বর, ২০২৫ ১২:২৯ পূর্বাহ্ন
ডিসেম্বর মানেই বিজয়ের মাস—পাকিস্তানি স্বৈরাচারের পতনের মাস। ডিসেম্বর বাঙালি জাতির আত্মত্যাগের মাস, নতুন সূর্যোদয়ের মাস। এই মাসেই কালো অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়ে লাল-সবুজ পতাকা বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়। জন্ম হয় এক স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের।
আজকের এই দিনে দীর্ঘ নয় মাসের ত্যাগ-তিতিক্ষা ও রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে বাংলাদেশ। বাংলার আকাশে উদিত হয় সাহসের প্রতীক লাল-সবুজ পতাকা। এ দেশের ছাত্র-অছাত্র, কৃষক-শ্রমিক, জেলে—খেটে খাওয়া আপামর জনতার সোচ্চার অংশগ্রহণে লেজ গুটিয়ে পালাতে বাধ্য হয় পাকিস্তানি স্বৈরাচারী ফ্যাসিস্টরা।
ত্রিশ লাখ মানুষের রক্তত্যাগ আর দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে পৃথিবীর বুকে জন্ম নেয় এক স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।
৫৪ বছর আগে, ১৯৭১ সালের এই দিনে চূড়ান্ত বিজয়ের মধ্য দিয়ে অবসান ঘটে তৎকালীন পাকিস্তানের স্বৈরশাসনের। যৌথ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে এ দেশ থেকে চিরতরে বিদায় নেয় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। মুক্তি পায় এ দেশের সাত কোটি নিরীহ-মজলুম বাঙালি। বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করে এক গৌরবময় রক্তমাখা বিজয়।
আজকের এই দিনেই অদম্য সাহসের প্রতীক হিসেবে বিশ্ব মানচিত্রে জায়গা করে নেয় রক্তমাখা লাল-সবুজের বংলাদেশ। তাই ডিসেম্বর বাঙালির কাছে অন্যরকম এক অনুভূতির নাম।
মহান বিজয় একদিনের ফসল নয়। ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান বিভাজনের মধ্য দিয়ে এর সূচনা। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই নানা বঞ্চনা ও লাঞ্ছনার শিকার হতে থাকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান। প্রথম আঘাত আসে ভাষার ওপর। পাকিস্তানের প্রায় ৫৭ শতাংশ মানুষের মাতৃভাষা বাংলা হলেও মাত্র ৭ শতাংশ মানুষের মাতৃভাষা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ষড়যন্ত্র শুরু করে নতুন সরকার। বাঙালির সাহসী কণ্ঠস্বরের কাছে ১৯৫২ সালে হার মানে পাকিস্তান সরকার; উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়।
তবু থামেনি ষড়যন্ত্র। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক—সব ক্ষেত্রেই পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের বঞ্চিত করতে থাকে কেন্দ্রীয় শাসকগোষ্ঠী। ভাষা আন্দোলন থেকে ছয় দফা, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান—সব মিলিয়ে ১৯৭১ ছিল ইতিহাসের অনিবার্য পরিণতি।
২৫ মার্চ কালরাতে ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে হত্যাযজ্ঞ চালায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। ঢাকাসহ সারা দেশে নির্বিচারে শুরু হয় গণহত্যা। ২৬ মার্চ আসে স্বাধীনতার ঘোষণা—‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’
এরপরই যুদ্ধে নেমে পড়ে পুরো পূর্ব পাকিস্তানের আপামর জনতা। শুরু হয় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক, পেশাজীবী—সবাই যে যার মতো করে যুক্ত হয় প্রতিরোধে। কেউ অস্ত্র হাতে নেয়, কেউ আশ্রয় দেয়, কেউ খবর বহন করে, কেউ জীবন বাজি রেখে মানুষ বাঁচায়। এভাবেই চলে টানা নয় মাস।
এই দীর্ঘ যুদ্ধে শহীদ হন ৩০ লাখ মানুষ। ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হন প্রায় ২ লাখ মা-বোন। গ্রাম-গঞ্জ জ্বালিয়ে দেয় পাকিস্তানি বাহিনী; প্রায় এক কোটি মানুষ শরণার্থী হয়ে আশ্রয় নেয় প্রতিবেশী দেশে।
বসে থাকেননি দেশের সাহসী বীর মুক্তিযোদ্ধারা। বাঁশ-লাঠি ও নামমাত্র অস্ত্র নিয়ে গেরিলা আক্রমণের মাধ্যমে পাকিস্তানি সেনাদের নাস্তানাবুদ করেন তাঁরা। ডিসেম্বরের শুরুতে যুদ্ধের মোড় ঘুরে যায়—মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে যোগ দেয় ভারতীয় সেনারা। মিত্রবাহিনীর সম্মিলিত আক্রমণে পাকিস্তানি বাহিনী কোণঠাসা হয়ে পড়ে।
অবশেষে ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে আত্মসমর্পণ করেন পাকিস্তানি কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল এ এ কে নিয়াজি। এর মধ্য দিয়েই অর্জিত হয় বাংলার স্বাধীনতা—অস্ত যায় পাকিস্তানি স্বৈরশাসন।
দিবসটি উপলক্ষে দেশের অন্যান্য এলাকার ন্যায় নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে সিলেটের জেলা প্রশাসন ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলো।
সিলেট জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে মঙ্গলবার সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পনের মাধ্যমে দিবসটির আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। এরপর সকাল ৯টায় আনুষ্ঠানিকভাবে সিলেট জেলা স্টেডিয়ামে জাতীয় পতাকা উত্তোলন
ও জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হবে। বেলা ১১টায় কবি কাজী নজরুল অডিটরিয়ামে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান সংবর্ধনা ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে।
সিলেট জেলা ও মহানগর বিএনপি মঙ্গলবার সকাল ১০টায় চৌহাট্টার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভা ও সমাবেশ করবে। একইভাবে এ দিন সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে ঐতিহাসিক ক্বিন ব্রিজ থেকে বর্ণাঢ্য বিজয় র্যালির আয়োজন করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। সিলেট জেলা ও মহানগর ছাত্রশক্তি ও যুবশক্তির যৌথ উদ্যোগে এ মিছিল অনুষ্ঠিত হবে।
এছাড়া বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সিলেট জেলা ও মহানগরসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের শ্রদ্ধা জানাবে।
মহান বিজয় দিবস, সিলেট, স্বাধীনতা অর্জন, গৌরবের দিন, বিজয়ের দিন