২১ মে ২০২৬

দৈনন্দিন / দিবস

আন্তর্জাতিক চা দিবস

চা-বাগানের নারীদের জীবন: সচেতনতা কম, স্বাস্থ্যঝুঁকি বেশি

মোসাইদ রাহাত

প্রকাশঃ ২১ মে, ২০২৬ ৭:১৩ অপরাহ্ন


সিলেটের মালিনীছড়া চা-বাগানের প্রখর রোদের নিচে দাঁড়িয়ে ৪৩ বছর বয়সী অঞ্জনা কুমারী প্রতিদিন গড়ে ২৩ কেজি চা-পাতা তোলেন। দিনের শেষে তার আয় মাত্র ১৮৭ টাকা। এই সামান্য আয়ে সংসার চালানোই যেখানে কঠিন, সেখানে আরও একটি নীরব সংকট প্রতিনিয়ত তাকে ও তার মতো হাজারো নারী শ্রমিককে ভোগাচ্ছে ঋতুস্রাবজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি ও অনিরাপদ জীবনযাপন।

অঞ্জনা কুমারী  বলেন, পরিবারে খাবারই ঠিকমতো জোটে না। স্যানিটারি ন্যাপকিন কেনার কথা ভাবাই যায় না। মাসিকের সময় পুরোনো, ছেঁড়া শাড়ি ব্যবহার করি। আমার দুই মেয়েও একইভাবে কাজ করে। তিনি জানান, তার দুই মেয়েকে এসএসসি পাসের পরই চা-বাগানের শ্রমিকদের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়েছে। তারাও একই মজুরিতে জীবন কাটাচ্ছেন।

আরেক শ্রমিক গীতা রায় বলেন, মাসিকের সময় কোমর আর পায়ের ব্যথা এত বেশি হয় যে মনে হয় হাড় ভেঙে যাচ্ছে। কিন্তু একটু বসলে সারাদিনের মজুরি কেটে যায়। কয়েক মাস আগে তীব্র ব্যথার কারণে দুই দিন কাজে যেতে না পারিনি বিধায় পুরো সপ্তাহের মজুরি থেকে বঞ্চিত করা হয় আমাকে।

সবশেষ শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় বলা হয়, সিলেটের প্রান্তিক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও চা-বাগান শ্রমিক সম্প্রদায়ের নারী ও কিশোরীদের মধ্যে প্রজননস্বাস্থ্য বিষয়ে চরম সচেতনতার অভাব এবং সামাজিক-ধর্মীয় কুসংস্কারের প্রভাব রয়েছে। ২০২৫ সালের শেষ দিকে পরিচালিত গবেষণার প্রাথমিক ফলাফলে দেখা গেছে, এসব প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নারী ও কিশোরীদের মধ্যে মাসিক স্বাস্থ্যবিধি ব্যবস্থাপনা এখনো চরমভাবে উপেক্ষিত। সামাজিক লজ্জা ও নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে অনেক নারী মাসিকজনিত জটিলতা হলেও চিকিৎসা নিতে চান না। অনেকেই এখনো স্যানিটারি ন্যাপকিনের পরিবর্তে কাপড় ব্যবহার করেন। ব্যক্তিগত গোপনীয়তার কারণে সেই কাপড় অন্ধকার ও স্যাঁতসেঁতে স্থানে শুকিয়ে পুনরায় ব্যবহার করা হয়, যা সংক্রমণ ও অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায় বলে জানান গবেষকেরা।


চা পাতা তুলা শেষে বাড়িতে ফিরছেন নারী শ্রমিকরা


গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, মাসিককালীন ব্যথা ও শারীরিক জটিলতাকে অনেক নারী ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে ধরে নেন। ফলে গুরুতর অসুস্থতার লক্ষণ থাকলেও তা উপেক্ষিত থেকে যায়। পরিবার পরিকল্পনা ও সন্তান জন্মদানের ক্ষেত্রেও নারীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সীমিত বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বাল্যবিয়ের পর গর্ভধারণের সিদ্ধান্তে স্বামী ও শাশুড়ির প্রভাব বেশি থাকে। বিয়ের পরপর সন্তান নেওয়ার জন্য নারীদের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয় এবং জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারে পরিবার থেকে নিরুৎসাহিত করা হয়।

গবেষণায় আরও বলা হয়, চা-শ্রমিক ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অনেক নারীর মধ্যে হাসপাতাল ও সিজারিয়ান ডেলিভারি নিয়ে ভয় রয়েছে। তাদের ধারণা, হাসপাতালে সন্তান জন্ম দিতে গেলে বাধ্যতামূলকভাবে সিজার করতে হয়।

গবেষণাটির নেতৃত্ব দেয়া শাবিপ্রবির সমাজকর্ম বিভাগের অধ্যাপক ফয়সাল আহমদ বলেন, সামাজিক ও ধর্মীয় কুসংস্কার দূর করা না গেলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য পরিস্থিতির উন্নয়ন কঠিন হবে। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে। মাসিককালীন ব্যথা ও শারীরিক জটিলতাকে অনেক নারী ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে ধরে নেন। ফলে গুরুতর অসুস্থতার লক্ষণ থাকলেও তা উপেক্ষিত থেকে যায়। কিন্তু এগুলো যদি ত্যাগ করে চা শ্রমিকদের জীবন মান উন্নয়নে কাজ করলে এটি সবার জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে বলে আমি বিশ্বাস করি।  

এদিকে বাগানের শ্রমিকদের চিকিৎসা দেয়া শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. রোকসানা ওয়াহিদ রাহি বলেন, নারী শ্রমিক নিয়মিত ও পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার না পাওয়ার ফলে রক্তস্বল্পতা, দুর্বলতা খুব সাধারণ একটি সমস্যা। এছাড়া দীর্ঘসময় ঝুঁকে চা-পাতা তোলা, ভারী ঝুড়ি বহন এবং প্রতিদিন শারীরিক শ্রমের কারণে কোমর, ঘাড়, হাঁটু ও পায়ের ব্যথা ব্যাপকভাবে দেখা যায়। পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা ও সচেতনতার অভাবে অনেক নারী শ্রমিক গাইনোকলজিক্যাল সমস্যা, অনিয়মিত মাসিক, গর্ভকালীন জটিলতা এবং সঠিক চিকিৎসার অভাবে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকেন। এছাড়া বৃষ্টি, কাদা, আর্দ্র পরিবেশ এবং দীর্ঘক্ষণ ভেজা অবস্থায় কাজ করার কারণে চর্মরোগ, ফাঙ্গাল ইনফেকশন ও অ্যালার্জি তাদের মধ্যে খুব দেখা যায়। পরিচ্ছন্ন পানির অভাব ও স্যানিটেশন সমস্যার কারণে কৃমি সংক্রমণ, ডায়রিয়া ও গ্যাস্ট্রিকের মতো সমস্যা প্রায়ই দেখা যায়।

তিনি আরও বলেন, চা-বাগানের শিশুরা যক্ষার ঝুঁকিতে সবচেয়ে বেশি থাকে। ঘনবসতিপূর্ণ ও অন্ধকারাচ্ছন্ন বাসস্থান, অপুষ্টি এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে এই রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। যক্ষার সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে। দীর্ঘদিন কাশি, জ্বর ও রাতের ঘাম, ওজন কমে যাওয়া, দুর্বলতা ও শ্বাসকষ্ট। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পর্যাপ্ত সুবিধা না থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা শুরু হতে দেরি হয়, যা পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে। এছাড়া চা-বাগান এলাকার শিশুদের মধ্যে কুষ্ঠ রোগও একটি উদ্বেগজনক স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে দেখা যায়, যদিও তুলনামূলকভাবে কম হারে।


শেয়ার করুনঃ

দৈনন্দিন থেকে আরো পড়ুন

চা দিবস, চা শ্রমিক, নারী, স্বাস্থ্য

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ