অপার সম্ভাবনা, তবু আমদানিতেই আটকে জকিগঞ্জ শুল্ক স্টেশন
ব্যবসা-বাণিজ্য
প্রকাশঃ ২৮ আগস্ট, ২০২৬ ৮:১০ অপরাহ্ন
সীমান্তের ওপারে ভারতের শ্রীভূমি, এপারে সিলেটের জকিগঞ্জ। মাঝখানে কুশিয়ারা নদী। ভৌগোলিক অবস্থান ও দুই দেশের বাণিজ্যিক চাহিদার কারণে সম্ভাবনার কমতি নেই জকিগঞ্জ স্থল শুল্ক স্টেশনে। অথচ সম্ভাবনার বিপরীতে বাস্তব চিত্র একেবারেই ভিন্ন।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, শুল্ক স্টেশনটিতে নেই আধুনিক অবকাঠামো, নেই পর্যাপ্ত গুদাম বা যাত্রীসুবিধা, পণ্য ওজনেও চলছে পুরোনো পদ্ধতি। আবার নৌকায় পণ্য পারাপারের কারণে বাড়ছে পরিবহন ব্যয় ও ঝুঁকি। তার ওপর ভারতের বিভিন্ন বিধিনিষেধে প্রায় বন্ধ রপ্তানি। ফলে দেশের অন্যতম পুরোনো এই সীমান্ত বাণিজ্যকেন্দ্র এখন মূলত সীমিত পরিসরে পণ্য আমদানি আর যাত্রী পারাপারের মধ্যেই আটকে আছে।
পুরোনো বন্দর, কমেছে বাণিজ্যের গতি
সিলেটের সীমান্তবর্তী জকিগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত জকিগঞ্জ স্থল শুল্ক স্টেশনটি দেশের পুরোনো সীমান্ত বাণিজ্যকেন্দ্রগুলোর একটি। ভারতের আসাম রাজ্যের করিমগঞ্জ জেলার শ্রীভূমি এলাকার সঙ্গে সংযুক্ত এই স্টেশন দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের ব্যবসায়ী ও বৈধ ভিসাধারী যাত্রীরা চলাচল করছেন।
১৯৪৭ সালে ছোট পরিসরে অস্থায়ীভাবে পাঁচটি পাকা ঘর নির্মাণের মাধ্যমে শুল্ক স্টেশনটির কার্যক্রম শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে বাণিজ্যের পরিসর কমে গেলে একসময় স্টেশনটি বন্ধ হয়ে যায়। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের উদ্যোগে ১৯৯৩ সালে এটি আবার চালু করা হয়। বর্তমানে স্টেশনটি সচল থাকলেও বাণিজ্যের পরিসর সীমিত। স্থানীয় হাতেগোনা কয়েকজন ব্যবসায়ী ভারত থেকে বিভিন্ন পণ্য আমদানি করে স্টেশনটির কার্যক্রম টিকিয়ে রেখেছেন। বিপরীতে দীর্ঘদিন ধরে রপ্তানি কার্যক্রম প্রায় বন্ধ।
আমদানিকারকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জকিগঞ্জ শুল্ক স্টেশন দিয়ে সবচেয়ে বেশি আমদানি হয় ফলমূল ও বিভিন্ন কৃষিপণ্য। এর মধ্যে সাতকরা, কমলা, আদা, পেঁয়াজসহ মৌসুমি বিভিন্ন পণ্য রয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে ভারত থেকে আদা আমদানিতে আগ্রহ কমেছে ব্যবসায়ীদের। কারণ, ভারতীয় আদা আমদানির ক্ষেত্রে পরিবহনসহ অন্যান্য খরচ তুলনামূলক বেশি। অন্যদিকে চীন, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও মিয়ানমার থেকে চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে আসা আদা তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যাচ্ছে। ফলে জকিগঞ্জ দিয়ে আমদানি করা পণ্যের তালিকা থাকলেও ব্যবসার পরিমাণ বাড়ছে না।
রপ্তানি প্রায় বন্ধ
জকিগঞ্জ শুল্ক স্টেশনের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতার একটি হলো রপ্তানি কার্যক্রম প্রায় বন্ধ থাকা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভারতের বিভিন্ন বিধিনিষেধ ও অনুমোদন জটিলতার কারণে বাংলাদেশ থেকে সরাসরি অনেক পণ্য রপ্তানি করা যাচ্ছে না।
জকিগঞ্জ শুল্ক স্টেশন আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি আবুল কালাম বলেন, বন্দরটি সচল থাকলেও বড় আমদানিকারকরা এখানে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। নৌকায় পণ্য পারাপারের কারণে আমদানি ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। বর্তমানে মূলত আদা, সাতকরা ও ফল আমদানি হচ্ছে। ভারত থেকে আদা আনতে খরচ বেশি হওয়ায় ব্যবসায়ীরা এখন বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকছেন।
রপ্তানি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভারতের কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞার কারণে এ পথে পণ্য রপ্তানি প্রায় বন্ধ। একসময় জকিগঞ্জ দিয়ে বাংলাদেশ থেকে তুলা রপ্তানি হলেও বর্তমানে ভারতের আসামের ব্যবসায়ীরা সোনা মসজিদ স্থলবন্দর দিয়ে ঘুরিয়ে পণ্য নিচ্ছেন। কারণ, জকিগঞ্জ দিয়ে সরাসরি রপ্তানির অনুমতি ভারত দিচ্ছে না।
জকিগঞ্জ শুল্ক স্টেশনের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ থাকলেও ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে পণ্য ও যাত্রী পারাপারের ক্ষেত্রে কুশিয়ারা নদী বড় একটি বাস্তব বাধা। নৌকায় পণ্য পারাপারের কারণে সময় ও খরচ দুটোই বাড়ছে।
আমদানিকারক ও মেসার্স মনজু ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী মো. মনজুর আহমদ বলেন, খুব কমসংখ্যক ব্যবসায়ী এ স্টেশন দিয়ে পণ্য আমদানি করেন। নদীপথে পণ্য পারাপারের কারণে পরিবহন ব্যয় বেশি। এ ছাড়া রয়েছে ঝুঁকি ও অতিরিক্ত মজুরি খরচ।
তার মতে, কুশিয়ারা নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণ করা গেলে এই স্টেশনের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা অনেকটাই বদলে যেতে পারে। তখন আরও ব্যবসায়ী এ পথে বাণিজ্যে আগ্রহী হবেন এবং পণ্য পরিবহনের খরচও কমে আসবে।
আধুনিক কাস্টমস ব্যবস্থাও নেই
স্টেশন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, একচালা টিনের একটি ঘরেই কাস্টমসের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। নেই আধুনিক কাস্টমস ভবন। পণ্য ওজনের জন্যও নেই ডিজিটাল স্কেল। এখনও অ্যানালগ পদ্ধতির ওজন মাপার যন্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়া পণ্য গুদামজাত করারও কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে আমদানি করা পণ্য দ্রুত সরিয়ে নিতে হয় ব্যবসায়ীদের। এতে ব্যবসার ব্যয় যেমন বাড়ছে, তেমনি আধুনিক বন্দর ব্যবস্থাপনার সুযোগ থেকেও পিছিয়ে থাকছে স্টেশনটি।
মনজুর আহমদ বলেন, কাস্টমসের কোনো নিজস্ব ভবন নেই। অবকাঠামোগত সুবিধার অভাবে ভারত থেকে আসা যাত্রীরাও হতাশ হন। এখানে বসার জায়গা নেই, টয়লেট নেই। পণ্য খালাসের ক্ষেত্রেও এখনও পুরোনো পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য অতীতে একাধিকবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।
বাণিজ্যিক কার্যক্রম সীমিত হলেও জকিগঞ্জ শুল্ক স্টেশন দিয়ে দুই দেশের বৈধ ভিসাধারী যাত্রীদের যাতায়াত রয়েছে। ভারতের কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন কার্যক্রম শেষে ছোট নৌকায় করে যাত্রীরা বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। একইভাবে বাংলাদেশ থেকেও যাত্রীরা ভারতে যান। তবে যাত্রীদের জন্যও পর্যাপ্ত সুবিধা নেই। নেই ভালো বসার ব্যবস্থা, নেই পর্যাপ্ত শৌচাগারসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো।
স্টেশনের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এটি মূলত একটি ‘বোট স্টেশন’ বা নৌকাভিত্তিক বন্দর। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা এখানে সাতকরা, আদা, পেঁয়াজ ও মৌসুমি ফল আমদানি করেন।
তিনি বলেন, এটি আন্তর্জাতিক চেকপোস্ট হওয়ায় বিভিন্ন দেশের পাসপোর্টধারী যাত্রীরা এ পথ ব্যবহার করতে পারেন। তবে ৫ আগস্টের পরবর্তী পরিস্থিতিতে যাত্রী পারাপার অনেকটাই কমেছে।
স্থলবন্দরে উন্নীত করার দাবি
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, জকিগঞ্জের ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগানো গেলে এটি সিলেটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। কিন্তু সেই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন আধুনিক অবকাঠামো।
ব্যবসায়ীদের দাবির মধ্যে রয়েছে কুশিয়ারা নদীর ওপর সেতু নির্মাণ, আধুনিক কাস্টমস ভবন, ডিজিটাল ওজন ব্যবস্থা, পণ্য গুদামজাতকরণের সুবিধা, যাত্রীদের জন্য বসার স্থান ও শৌচাগার নির্মাণ এবং দ্রুত পণ্য খালাসের ব্যবস্থা।
তাদের মতে, শুল্ক স্টেশনটিকে পূর্ণাঙ্গ স্থলবন্দরে উন্নীত করা গেলে শুধু আমদানি নয়, রপ্তানি কার্যক্রমও বাড়বে। এতে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং সরকারের রাজস্ব আয়ও বাড়বে।
জকিগঞ্জ শুল্ক স্টেশনের এক কর্মকর্তা মনে করেন, অবকাঠামোগত উন্নয়নের সঙ্গে বাণিজ্যের পরিমাণেরও সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। বর্তমানে এখানে পণ্যের চাহিদা ও আমদানি-রপ্তানির পরিমাণ সীমিত হওয়ায় বড় ধরনের অবকাঠামো উন্নয়ন নিয়ে সংশ্লিষ্টদের আগ্রহও কম।
তার ভাষ্য, ব্যবসায়ীরা যদি আমদানির পরিমাণ বাড়ান এবং অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য জোরালো দাবি জানান, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হবে।
কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট সিলেট সদর দপ্তরের সহকারী কমিশনার প্রদীপ দাস বলেন, জকিগঞ্জ স্টেশনটি পূর্ণাঙ্গ বন্দর নয়; এটি একটি এলসি স্টেশন। এ কারণে এখানে পূর্ণাঙ্গ স্থলবন্দরের মতো সব সুযোগ-সুবিধা নেই। সরকার বিভিন্ন এলসি স্টেশনকে পূর্ণাঙ্গ বন্দরে রূপান্তরের কাজ করছে। ভবিষ্যতে জকিগঞ্জকেও পূর্ণাঙ্গ বন্দরে রূপান্তরের সুযোগ রয়েছে। তখন অবকাঠামোসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়ন করা সম্ভব হবে।
কুশিয়ারা নদীর ওপর সেতু নির্মাণের বিষয়ে প্রদীপ দাস বলেন, এটি শুধু বাংলাদেশের একক সিদ্ধান্তের বিষয় নয়; দুই দেশের সরকারের পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা লিখিতভাবে দাবি জানালে তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে।
জকিগঞ্জ শুল্ক স্টেশন, আমদানি-রপ্তানি, বাণিজ্যিক চাহিদা, কুশিয়ারা নদী, সীমান্ত বাণিজ্যকেন্দ্র, কৃষিপণ্য