
রাত তখন প্রায় পৌনে দুইটা। কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ হোটেলের একটি কক্ষে ঘুমিয়ে ছিলেন বাংলাদেশি দম্পতি সোমাইয়া আখতার ও রেজাউল ইসলাম। হঠাৎ দরজায় জোরে জোরে ধাক্কার শব্দে তাদের ঘুম ভেঙে যায়। দরজা খুলতেই চোখে পড়ে ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন বারান্দা। বুঝতে পারেন, ভবনে আগুন লেগেছে।
সামনে তখন দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়। দরজা দিয়ে বের হওয়ার সুযোগ নেই। আতঙ্কের মধ্যেও রেজাউল ইসলাম স্ত্রীকে নিয়ে জানালার দিকে এগিয়ে যান। জানালা খুলে দুজন নেমে পড়েন তিনতলার কার্নিসে। সেখানেই প্রায় আধঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে সাহায্যের জন্য চিৎকার করতে থাকেন তারা। পরে দমকলকর্মীরা মই দিয়ে তাদের উদ্ধার করেন।
আগুনের ওই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পরও আতঙ্ক কাটেনি সোমাইয়া ও রেজাউলের। উদ্ধারের কয়েকঘণ্টা পরও বারবার তাদের মনে পড়ছে সেই রাতের কথা কীভাবে ঘর থেকে বের হলেন, কীভাবে কার্নিসে দাঁড়িয়ে থাকলেন আর কীভাবে দমকলকর্মীরা তাদের নিরাপদে নিচে নামিয়ে আনলেন।
সোমাইয়া আখতার বলেন, ‘রাত ১টা ৫০ মিনিটের দিকে হঠাৎ আমাদের ঘরের দরজায় কেউ জোরে জোরে ধাক্কা দিতে থাকেন। আমি সজাগ ছিলাম। ধাক্কার শব্দে আমার স্বামীর ঘুম ভেঙে যায়। দুজনেই বিছানা থেকে উঠে দরজা খুলে দেখি, বারান্দা ধোঁয়ায় ভরে গেছে।’
ঘরের বাইরে ধোঁয়া আর চিৎকারের মধ্যে রেজাউল দ্রুত পরিস্থিতি বুঝে নেন। স্ত্রী যাতে বেশি আতঙ্কিত না হন, সেদিকেও খেয়াল রাখছিলেন তিনি। একই সঙ্গে বের হওয়ার পথ খুঁজছিলেন। শেষ পর্যন্ত দরজা দিয়ে না গিয়ে জানালা দিয়ে বের হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
সোমাইয়া বলেন, ‘আমার স্বামী দ্রুত সিদ্ধান্ত নেন, দরজা দিয়ে বের না হয়ে জানালা দিয়ে বের হবেন। এরপর আমরা দুজন জানালার কাছে যাই। জানালা খুলে কার্নিসে নেমে পড়ি।’
তিনতলার ওই কার্নিস থেকে নিচের রাস্তা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না। আবার নিচ থেকে তাকালেও কার্নিসে কেউ আটকে আছেন কি না, সহজে বোঝার উপায় ছিল না। তাই মোবাইল ফোনের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে নিচের মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন তারা।
সোমাইয়া বলেন, ‘কার্নিসে দাঁড়িয়ে হেল্প, হেল্প, আগুন আগুন বলে চিৎকার করছিলাম।’
নিচ দিয়ে যাওয়া লোকজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে নিজেদের অবস্থার কথা জানান তারা। এভাবে প্রায় আধ ঘণ্টা কার্নিসে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় তাদের।
সোমাইয়া বলেন, ‘রাস্তা দিয়ে যাঁরা যাচ্ছিলেন, তাদের ডেকে আমাদের বিপদের কথা বলি। প্রায় আধঘণ্টা ওই অবস্থায় আমরা কার্নিসে দাঁড়িয়ে ছিলাম।’
পরে দমকলকর্মীরা মই নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তিনতলার কার্নিস থেকে সোমাইয়া ও রেজাউলকে নিরাপদে নিচে নামিয়ে আনেন তারা। দীর্ঘ উৎকণ্ঠার পর স্বস্তি ফেরে দম্পতির মধ্যে।
সপ্তাহখানেক আগে বাংলাদেশ থেকে কলকাতায় ঘুরতে এসেছিলেন সোমাইয়া ও রেজাউল। দুদিন আগে নিউ মার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ হোটেলে তারা একটি কক্ষ ভাড়া নেন। আগুন লাগার সময় তারা ওই কক্ষেই ছিলেন।
তাদের মতো ওই ভবনের হোটেলগুলোতে বাংলাদেশ থেকে আসা আরও অনেক মানুষ অবস্থান করছিলেন। কেউ চিকিৎসার জন্য, কেউ ব্যবসায়িক কাজে কলকাতায় গিয়েছিলেন। আগুনের ঘটনায় এখন পর্যন্ত নয়জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে কুষ্টিয়ার সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত, তার স্ত্রী আফসানা শিম্মিন (২৫), দুই বছরের সন্তান স্বর্ণশীষ দত্ত এবং শ্বশুর মো. আকরাম আলী (৬৪)।
শেয়ার করুনঃ
দৈনন্দিন থেকে আরো পড়ুন
কলকাতা হোটেলে আগুন, কলকাতায় অগ্নিকাণ্ড, বাংলাদেশি দম্পতি, সোমাইয়া আখতার, রেজাউল ইসলাম, শিখা ইন হোটেল, মির্জা গালিব স্ট্রিট, নিউ মার্কেট কলকাতা


