১৭ জুলাই ২০২৬

দৈনন্দিন / গ্রামবাংলা

সুনামগঞ্জের হাওরে আফালের তাণ্ডব: বিশ্বম্ভরপুরে ২০ পরিবারের ঘর জলে বিলীন

নিজস্ব প্রতিবেদক, সুনামগঞ্জ

প্রকাশঃ ১৭ জুলাই, ২০২৬ ২:০৩ অপরাহ্ন


বর্ষা মৌসুম শুরু হতেই সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে ফিরে এসেছে স্থানীয়দের কাছে পরিচিত এক আতঙ্কের নাম ‘আফাল’। হাওরের উত্তাল ঢেউকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় আফাল, আর প্রতি বছর এই ঢেউয়ের আঘাতেই ভেঙে পড়ছে বসতভিটা, বিলীন হয়ে যাচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম। নৌকাডুবির ঘটনায় নারী-শিশুসহ নানা বয়সী মানুষের প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে নিয়মিত।

সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার করচার হাওরপাড়ে অবস্থিত বাহাদুরপুর গ্রাম এবার আফালের সবচেয়ে বড় শিকারে পরিণত হয়েছে। মূলত জেলে পরিবারের বসবাস এই গ্রামে, যাদের অধিকাংশই নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির। গত এক দশকে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর প্রবল ঢেউয়ের ধাক্কায় গ্রামের বহু বসতভিটা হাওরগর্ভে তলিয়ে গেছে। ভিটেমাটি হারিয়ে ইতিমধ্যে এলাকা ছেড়েছে অনেক পরিবার।

সাম্প্রতিক অবিরাম বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে ভয়াবহ আফাল। দিনরাত অবিরাম ঢেউয়ের আঘাতে এ পর্যন্ত অন্তত ২০টি মৎস্যজীবী পরিবারের ঘরবাড়ি হাওরে বিলীন হয়ে গেছে। ঘরবাড়ি ভাঙার হৃদয়বিদারক দৃশ্য ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও। কেউ কেউ বাঁশ ও কচুরিপানা দিয়ে অস্থায়ী বেড়া বানিয়ে ভিটে রক্ষার মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন, আবার অনেকে উপায়ান্তর না দেখে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটছেন।

ক্ষতিগ্রস্তদের দাবি, ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিটি গ্রামে স্থায়ীভাবে ওয়েভ প্রটেকশন ওয়াল নির্মাণ না করলে এই দুর্ভোগ থেকে রেহাই মিলবে না। তাদের অভিযোগ, পাহাড়ি ঢল আর আফালে সর্বস্ব হারানো পরিবারগুলোর পাশে এখনো কেউ দাঁড়ায়নি।

বাহাদুরপুর গ্রামের বাসিন্দা সুষমা বর্মণ বলেন, গত তিন দিন ধরে ঘুমাতে পারছি না। ঢেউয়ে ঘরের অর্ধেক হাওরে চলে গেছে। কখন বাকি অংশও ভেঙে যায় সেই আতঙ্কে আছি। ঘর ভেঙে গেলে সন্তানদের নিয়ে কোথায় যাব, জানি না।

একই গ্রামের বাসিন্দা নিখিল বর্মণ বলেন, আমাদের মতো গরিব মানুষের খবর কেউ রাখে না। প্রতিবছর আফালের তা-বে অনেক ঘরবাড়ি বিলীন হয়ে যায়। কিন্তু স্থায়ীভাবে ভাঙন রোধে কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না। এখনই ব্যবস্থা না নিলে এ বর্ষায় আরও অনেক ঘর হাওরে চলে যাবে।

স্থানীয়দের মতে, বাহাদুরপুরের এই চিত্র এখন গোটা হাওরাঞ্চলেরই প্রতিচ্ছবি। একের পর এক গ্রাম আফালের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, বাড়ছে জীবন ও সম্পদহানির ঝুঁকি।

হাওর বাঁচাও আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এ কে কুদরত পাশা বলেন, আগে হাওরে প্রচুর হিজল, করচ ও অন্যান্য জলজ উদ্ভিদ থাকায় ঢেউয়ের তীব্রতা কম ছিল। কিন্তু পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ায় এখন আফালের ভয়াবহতা বেড়েছে।

তিনি আরও বলেন, হাওরকে হাওরের মতো থাকতে দিতে হবে। হাওর ভরাট করে নতুন বসতি গড়ে তোলা বন্ধ করতে হবে। হাওরপাড়ে হিজল-করচ গাছের ব্যাপক বনায়ন এবং সরকারি অর্থায়নে ভিলেজ প্রটেকশন ওয়াল নির্মাণ করলে আফালের ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য সরকারি টিন বরাদ্দ দেয়া আছে। আবেদন পেলে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে টিন বিতরণ করা হবে।

তিনি জানান, আফাল ও নদীভাঙন থেকে বসতি রক্ষায় নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণের কথা ভাবছে সরকার।


শেয়ার করুনঃ

দৈনন্দিন থেকে আরো পড়ুন

সুনামগঞ্জ, আফাল, হাওর, পরিবেশ

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ