২৬ আগস্ট ২০২৬

সিলেটজুড়ে

সুনামগঞ্জে সড়ক প্রশস্ত করতে কাটা হচ্ছে ৪৩৪ গাছ, নদী ভাঙনের শঙ্কা

প্রতিনিধি, সুনামগঞ্জ

প্রকাশঃ ২৬ আগস্ট, ২০২৬ ৯:২২ অপরাহ্ন


সুনামগঞ্জের পর এবার জেলার ছাতক ও দোয়ারাবাজার উপজেলার সড়ক ও নদীতীরবর্তী এলাকা থেকে শতাধিক বছরের পুরনো গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। সড়ক প্রশস্ত করার জন্য ছাতক-গোবিন্দগঞ্জ সড়কের ১৩ কিলোমিটার অংশে থাকা ৪৩৪টি গাছ ইতিমধ্যে নিলামে বিক্রি করেছে বন বিভাগ। এরই মধ্যে ঠিকাদারের লোকজন গাছগুলো কেটে নিয়ে যাচ্ছেন।


স্থানীয়রা বলছেন, সড়কের পাশ ও নদীতীর ঘেঁষে বেড়ে ওঠা এসব পরিণত গাছ এতদিন প্রাকৃতিকভাবে ভাঙন ঠেকাতে ভূমিকা রেখেছে। গাছগুলো কেটে ফেলার ফলে নদীতীরের মাটি দুর্বল হয়ে বর্ষায় ভাঙন বাড়তে পারে। এছাড়া গাছ কাটার পাশাপাশি নতুন করে বনায়ন বা একটি গাছের বিপরীতে দুটি করে চারা রোপণের কোনো উদ্যোগও দেখা যাচ্ছে না।


ছাতক বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সওজের আওতাধীন ছাতক-গোবিন্দগঞ্জ সড়কের ১৩ কিলোমিটার অংশ প্রশস্ত করার কাজ শিগগির শুরু হওয়ার কথা। এ জন্য তকিপুর মসজিদ থেকে তাজপুর বাজার পর্যন্ত সড়কের পাশে থাকা ৪৩৪টি গাছ চিহ্নিত করা হয়। সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পের দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর সরকারি নিলামের মাধ্যমে গাছগুলো বিক্রি করা হয়েছে।  নিলামে বিক্রি হওয়া গাছের মধ্যে ১৭৪টি রেইনট্রি, ১১৪টি মেহগনি, ২৮টি আকাশমণি, ৪৫টি শিশু, ২৬টি জাম, ১০টি পিটালি, ১০টি অর্জুন, ৭টি ছাতিয়ান, ৬টি জারুল, ৬টি গামার, ৩টি কড়ই, ২টি চাম্বুল, ২টি কদম ও ১টি বাবলা রয়েছে।  এসব গাছ থেকে আনুমানিক ৩ হাজার ৫২৯ ঘনফুট কাঠ এবং ২ হাজার ৬৭১ ঘনফুট জ্বালানি কাঠ পাওয়া যাবে বলে বন বিভাগের হিসাব।


সিলেটের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আব্দুর রহমানের স্বাক্ষর করা কার্যাদেশে বলা হয়েছে, ৪৩৪টি গাছ ১৩ লাখ ৪০ হাজার টাকায় নিলামে বিক্রি করা হয়েছে। এর মধ্যে উপকারভোগীদের জন্য ৯ লাখ ৬৪ হাজার ৮০০ টাকা এবং সরকারি কোষাগারে ৩ লাখ ৭৫ হাজার ২০০ টাকা জমা হবে। বর্তমানে নিলামে গাছ কেনা ঠিকাদারের লোকজন সেগুলো কেটে সরিয়ে নিচ্ছেন।


এদিকে  স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, ছাতক থেকে দোয়ারাবাজার পর্যন্ত সড়কের বড় একটি অংশ নদীর কাছাকাছি দিয়ে গেছে। বছরের পর বছর ধরে সড়কের পাশে বেড়ে ওঠা গাছগুলোর শিকড় নদীতীরের মাটি আঁকড়ে ধরে রেখেছিল। বর্ষায় নদীর পানি বাড়লে স্রোত ও ঢেউয়ের আঘাত থেকে তীরকে কিছুটা সুরক্ষা দিত এসব গাছ। এখন গাছগুলো কেটে ফেলায় নদীতীরের মাটি আগের তুলনায় দ্রুত আলগা হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। এছাড়া ভারী বৃষ্টি ও নদীর প্রবল স্রোতের সময় এতে ভাঙনের ঝুঁকি আরও বাড়বে।


স্থানীয়দের অভিযোগ, সড়ক উন্নয়ন ও প্রশস্তকরণের প্রয়োজন থাকলেও এর সঙ্গে পরিবেশ ও নদীতীর সুরক্ষার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া দরকার ছিল। তাদের দাবি, গাছ কাটার পাশাপাশি নতুন করে বনায়ন করা এবং নদীতীর রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।


সড়ক দিয়ে নিয়মিত চলাচলকারী গাড়িচালক কামাল উদ্দিন বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে তিনি এই পথে গাড়ি চালাচ্ছেন। রাস্তার পাশের বড় গাছগুলো পথচারী ও যাত্রীদের ছায়া দেওয়ার পাশাপাশি চালকদেরও স্বস্তি দিত। এখন নদীতীর ঘেঁষে থাকা এসব গাছ কেটে ফেলায় আগামী বর্ষায় দোয়ারাবাজার অংশে নদী ভাঙনের আশঙ্কা বহুগুণ হবে।’


নোয়ারাই ইউনিয়নের লক্ষ্মীবাউড় গ্রামের বাসিন্দা ও শিক্ষার্থী সুমন আহমেদ বলেন, ‘রাস্তার পাশের পুরনো গাছগুলো শুধু ছায়াই দিত না, পুরো এলাকার সৌন্দর্যও বাড়াত। নদীর পাড়ের দৃশ্য এসব গাছের কারণে আরও সুন্দর লাগত। সড়ক উন্নয়নে এভাবে এতগুলো পুরনো গাছ কাটার প্রভাব ইতিবাচক হবে না। সেই সঙ্গে প্রাকৃতিক ভারসাম্যও নষ্ট হবে।’


ছাতক-দোয়ারাবাজার অঞ্চলের স্থানীয় বন কর্মকর্তা কেবিএম ফেরদৌস বলেন, গাছগুলো কাটার জন্য সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে আগেই কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছিল। সড়ক প্রশস্তকরণের জন্য সড়কের পাশের অতিরিক্ত গাছ নিয়ম মেনে নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করা হয়েছে।


প্রসঙ্গত, এর আগে সুনামগঞ্জ-সাচনাবাজার সড়ক সম্প্রসারণের কথা বলে সড়কের দুই পাশে থাকা প্রায় সাড়ে চার হাজার গাছ কাটার উদ্যোগ নেয় বন বিভাগ। এ নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও একাধিক পরিবেশবাদী সংগঠন প্রতিবাদে বিক্ষোভ ও সমাবেশ করে। সমাবেশ থেকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গাছ কাটা বন্ধের আল্টিমেটাম দেওয়া হয়। অন্যথায় বন বিভাগের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালনের হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়। এর মধ্যে সাড়ে চার হাজার গাছের প্রায় অর্ধেক কেটে ফেলা হয়। পরে স্থানীয়দের বিক্ষোভ ও পরিবেশবাদীদের আন্দোলনের মুখে জেলা প্রশাসন জরুরি বৈঠক করে গাছ কাটা বন্ধের নির্দেশ দেয়। একই সঙ্গে গাছ কাটার সিদ্ধান্ত ও এর প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।


শেয়ার করুনঃ

সিলেটজুড়ে থেকে আরো পড়ুন

সুনামগঞ্জ-সাচনাবাজার সড়ক, সাড়ে চার হাজার গাছ, গাছ কাটা, জেলা প্রশাসন, বন বিভাগ, পরিবেশ আন্দোলন, বিক্ষোভ, তদন্ত কমিটি

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ